খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির নামে নজিরবিহীন দুর্নীতি

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ১০ টাকা কেজি চালের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির নামে নজিরবিহীন দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে মাঠ পর্যায়ে। খোদ স্পিকারের নির্বাচনী আসন রংপুরের পীরগঞ্জের শানেরহাট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সেই দুর্নীতির মডেল। এখানে এক ব্যক্তির আইডি কার্ড বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ব্যবহার, ব্যক্তি না থাকলেও নাম ব্যবহার, মৃত ব্যক্তির নামে বরাদ্দ, ভূয়া আইডি কার্ড নম্বর ব্যবহার, কখনও আইডি কার্ড নম্বরের ডিজিট বেশি কখনও কম, আইডি কার্ড নম্বর বিহীন ব্যক্তি, সম্পদশালীদের বরাদ্দ, নাম একজনের আইডি কার্ড নম্বর অন্যজনের, একই ব্যক্তির নামে একাধিক কার্ডসহ অন্তত ১৯ ধরনের অনিয়মের সত্যতা মিলেছে মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে। বিষয়টি নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পীরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। আর জেলা প্রশাসন বলছে, অনিয়মের ঘটনায় কেউ পার পাবে না। সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নজিরবিহীন অনিয়মের এই চিত্র। 

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ১০ টাকা কেজি চালের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির নামে নজিরবিহীন দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে মাঠ পর্যায়ে। খোদ স্পিকারের নির্বাচনী আসন রংপুরের পীরগঞ্জের শানেরহাট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সেই দুর্নীতির মডেল। এখানে এক ব্যক্তির আইডি কার্ড বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ব্যবহার, ব্যক্তি না থাকলেও নাম ব্যবহার, মৃত ব্যক্তির নামে বরাদ্দ, ভূয়া আইডি কার্ড নম্বর ব্যবহার, কখনও আইডি কার্ড নম্বরের ডিজিট বেশি কখনও কম, আইডি কার্ড নম্বর বিহীন ব্যক্তি, সম্পদশালীদের বরাদ্দ, নাম একজনের আইডি কার্ড নম্বর অন্যজনের, একই ব্যক্তির নামে একাধিক কার্ডসহ অন্তত ১৯ ধরনের অনিয়মের সত্যতা মিলেছে মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে। বিষয়টি নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পীরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। আর জেলা প্রশাসন বলছে, অনিয়মের ঘটনায় কেউ পার পাবে না। সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নজিরবিহীন অনিয়মের এই চিত্র।

২০১৬ সালে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় উপজেলার শানেরহাট ইউনিয়নের ৯ টি ওয়ার্ডে ১ হাজার ৩৫০ জনের নামে ১০ টাকা দরে চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রত্যেক উপকারভোগী বছরে ৫ দফায় ৩০ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা। কিন্তু শানেরহাট ইউনিয়নের নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মন্টু ১৯ ধরনের নজিরবিহীন অনিয়মের মাধ্যমে পুরো খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ১০ টাকার চালের অনিয়মের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। অনিয়মে দেখা গেছে, মৃত ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দিয়ে সেই চাল তুলে পুরো টাকাটাই আত্মসাত করা হয়েছে। মৃত ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দেয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছে ১ নং ওয়ার্ডের পার্বতীপুর গ্রামের রহিম মন্ডল (কার্ডনং ১১৯০), শহিদুল (১০), সৈয়দ আলী (২৮), সামাদ (২১২), রহিম (১৯৮), দামোদারপুরের আনারুল (১১৭), ৩ নং ওয়ার্ডের ঘোষপুরের মহির(৩৩৩), ৪ নং ওয়ার্ডের মেস্টাগ্রামের রাশেদুল (৪৪৮), মিঠু (৩৫০), বারি মন্ডল (৪০২), রওশন আরা (৪৭৬), গোলাপ (৪৬১), এন্তাজ (৪৮২), লাবলু (৪৫৪),  ৫ নং ওয়ার্ডের রাউতপাড়ার রাজেকা (৪৯৩), ৬ নং ওয়ার্ডের পবন পাড়ার হক মন্ডল (৬৮২), পালানু সাহাপুরের সাত্তার মিয়া (১২৯৪) ও সপুর (৫৭৭), ৭ নং ওয়ার্ডের ধরলাকান্দির শিবধারী রাম(৮৫২), ৮ নং ওয়ার্ডের  প্রথম ডাঙ্গা গ্রামের জোহরা (৯৭৩), মনুছর (৯৮৮), ছোট পাহাড়পুর গ্রামের ফুলমতি (৮৬৩),৯ নং ওয়ার্ডের বড়পাহারপুর গ্রামের ছাবাত (১০৮৮), মনোরঞ্জন (১১২৩), পাহারপুর গ্রামের সাহা (৯৪৮) ও সুখি চন্দ্র(১০৬১) অন্যতম। এসব মৃত ব্যক্তির নামে গত তিন বছর ধরে ১০ টাকার চাল ১১ টন ৭০০ কেজি চাল বরাদ্দ নিয়ে এবং তা তুলে আত্মসাত করা হয়। যার বাজার মূল্য (১০ টাকা দরে ক্রয় মূল্য বাদে) প্রায় ১৭ লাখ ৫৫ হাজার ৫০০ টাকা। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর গত ১৯ সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যান এসব মৃত নামের জায়গায় নতুন নাম প্রতিস্থাপন করেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইউনিয়নটির ১৭টি গ্রামেই ভুয়া নাম ও আইডি ব্যবহার করে চাল উত্তোলন করে তা আত্মসাত করা হয়েছে।

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার আব্দুল মান্নান মন্ডল জানান, “মৃত ব্যক্তির নামের তালিকা আমার কাছে আসার পর আমি সেসব তালিকা ফেরত দিয়েছিলাম। সেই তালিকায় চাল দেই নি। কিন্তু পরবর্তীতে চেয়ারম্যান সুপারিশ করে আমাকে বাধ্য করেছে মৃত ব্যক্তির নামে চাল দিতে। সেকারণে আমি গত তিন বছর থেকে মৃত ব্যক্তির নামেও চাল দিতে বাধ্য হয়েছি।”

দামোদারপুর গ্রামের আবুল কাশেমের স্ত্রী ফজিলতা জানান, “আমি কোনো দিনও ইউনিয়ন পরিষদে আমার এনআইডি কার্ড ও ছবি জমা দেইনি। তারপরেও তালিকায় আমার এনআইডি কার্ড ব্যবহার করে চারজন তিন বছর ধরে ১০ টাকার চাল উত্তোলন করছেন। বিষয়টি অমার্জনীয় অপরাধ। আমার আইডি কার্ড দিয়ে কেন একাধিক মানুষ চাল পাবে। এই ব্যাপারে আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার দাবি করছি।”

৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. কলিম উদ্দিন জানান, “আমার দিগদাড়ি গ্রামে যে ১৮ জনের নাম দিয়ে চাল তোলা হচ্ছে। ওইসব নাম ভুয়া। এই গ্রামে ওই নামে কোনো ব্যক্তি নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিকে বিতর্কিত করতেই ইউপি চেয়ারম্যান প্রতিটি গ্রামেই ভুয়া নাম দিয়ে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকা তৈরি করে তা আত্মসাত করছেন। এ বিষয়ে এখনই তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নিতে হবে।”

শানেরহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মেজবাহুর রহমান জানান, “বর্তমান চেয়ারম্যান আমার রাউৎপাড়া গ্রামে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির যে তালিকায় বরাদ্দ দিচ্ছেন, সেই তালিকার ১৮ জন ব্যক্তি আমার গ্রামের নন। ওই নামে আমার গ্রামে কিংবা ভোটার তালিকায় কোনো নাম নেই। সম্পূর্ণ ভুয়া নাম ব্যবহার করে এসব ব্যক্তির নামে চেয়ারম্যান সিন্ডিকেট চাল উত্তোলন করে আত্মসাত করছেন। বিষয়টি এলাকায় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আইডি কার্ড এবং ব্যক্তি সঠিক থাকলেও তারা চাল পায় না।”

ধরলাকান্দি গ্রামের সালামের স্ত্রী জোড়বানু (৭৭৭) জানান, “আমার নামে ৩ বছর ধরে চাল তোলা হয়েছে। আমি জানি না। বিষয়টি জানার পর সাংবাদিক আমার বাড়িতে আসলে ইউপি মেম্বার নজরুল ইসলাম আমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে জোড় করে ভিডিও করে নেয়।”

শানেরহাট ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের সভাপতি মো. আব্দুল বারী জানান, “আমার চিকিৎসার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ১ লাখ টাকা দিয়েছেন। কিন্তু আমার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ভুয়া এনআইডি, এনআইডির ডিজিট কম ও বেশি দেখিয়ে ১০ টাকার চাল আত্মসাত করে আমার প্রধানমন্ত্রীর খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিকে বিতর্কিত করেছেন। এধরনের দুর্নীতিবাজ মানুষ যদি থাকে, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যেকটি ভালো কাজ বিতর্কের মুখে পড়বে। এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।”

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য ও দামোদারপুর গ্রামের মো. জয়নাল আবেদীন জানান, “খাদ্যবান্ধব তালিকায় নাম আছে ১ হাজার ৩৫০ জনের। এর মধ্যে যদি ২৩১ জন ব্যক্তির আইডি কার্ড ব্যবহার করে চাল উঠানো হয়, কিন্তু ওই আইডিকার্ডধারী ব্যক্তি চাল পান না। বিষয়টি ইউনিয়নে ওপনে সিক্রেট। এটা নজিরবিহীন দুর্নীতি। কিন্তু তার পরেও আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে চেয়ারম্যান বহাল তবিয়তে থাকেন কিভাবে। যিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিকে বিতর্কের মুখে ফেলেছেন। এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।”

ইউনিয়নের সাবেক রিলিফ চেয়ারম্যান খবির উদ্দিন জানান, “এনআইডি নম্বর ছাড়া তালিকা তৈরি করা, ভোটার তালিকায় নাম না থাকা সত্ত্বেও বিধি ভেঙে বরাদ্দ তালিকায় নাম দেয়া, একই ব্যক্তির নামে একাধিক কার্ড বরাদ্দ দেয়া এবং খাদ্যবান্ধব ও কর্মসূচিতে একই ব্যক্তির নাম দেয়ার মাধ্যমে ইউনিয়নে ১০ টাকার চাল নিয়ে হযবরল পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সুনাম এখানে দারুণভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের আসন পীরগঞ্জেই যদি একজন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করেন, তাহলে আমরা কোথায় যাবো। সেই ব্যক্তি আবার কাউন্সিলে আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রার্থী।” তিনি বলেন, “আশা করি আওয়ামী লীগের চলমান শুদ্ধি অভিযানে বিষয়টি নজরে আসবে উপজেলা ও জেলা নেতৃবৃন্দের।”

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য হরিরাম সাহাপুর গ্রামের মন্টু জানান, “আমি রিকশা চালিয়ে জীবনযাপন করি। আমি ১০ টাকার চাল তো দূরের কথা, সরকারি কোনো সুবিধাই পাই না। অথচ চেয়ারম্যান সাহেবের ভাই কোটিপতি ব্যবসায়ী, তার এনআইডি দিয়ে চাল তোলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হোক।”

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সেলিম সরদার জানান, “ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি সকল বরাদ্দে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের কথা আমার কাছে এসেছে। কিছু কিছু বিষয়ে আমিও সত্যতা পেয়েছি। বিষয়গুলোর তদন্তের মাধ্যমে সুরাহা দরকার।”

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে সভাপতি প্রার্থী মিজানুর রহমান মন্টু জানান, “আমার প্রতিপক্ষ আমাকে হেয় করার জন্য আমার নামে এসব কুৎসা রটাচ্ছে। এসব অভিযোগ সঠিক নয়, তবে গত ১৯ সেপ্টেম্বর মৃত, একাধিক ভোক্তা, ঢাকায় অবস্থান, স্বচ্ছল এধরনের ৬৬ জনের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়ে সেখানে প্রকৃত দুস্থদের নাম তালিকাভুক্ত করে তালিকা সংশোধন করা হয়েছে। যদি আরো পাওয়া যায়, সেটাও সংশোধন করা হবে।”

পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল মোমিন জানান, “ওই ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে এখনও তদন্ত রিপোর্ট আসেনি।” তিনি বলেন, “এর আগেও আমি পীরগঞ্জ অডিটোরিয়ামে একটি আলোচনা সভায় ওই চেয়ারম্যান সাহেবকে বিষয়গুলো নিয়ে অভিযোগের ব্যাপারে বলেছিলাম।”

রংপুরের জেলা প্রশাসক আসিব আহসান বলেন, “যেহেতু এ ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। সরকারি বরাদ্দে যদি কেউ অনিয়ম করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।”

Download Nulled WordPress Themes
Download WordPress Themes
Download Nulled WordPress Themes
Download Best WordPress Themes Free Download
download udemy paid course for free