গ্যাস-বিদ্যুতের দাম নিয়ে কৌশলে সরকার

গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নিয়ে কৌশলে হাঁটছে সরকার। সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া ঠেকাতে এই কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী ফোরামে এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। ভোটের রাজনীতি ও দেশের প্রান্তিক মানুষকে রেহাই দিতে সরকার গ্যাসের দাম থেকে অর্থ তুলে সমন্বয় করতে চায়।
Ashraful IslamMay 13, 20191min0

গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নিয়ে কৌশলে হাঁটছে সরকার। সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া ঠেকাতে এই কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী ফোরামে এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। ভোটের রাজনীতি ও দেশের প্রান্তিক মানুষকে রেহাই দিতে সরকার গ্যাসের দাম থেকে অর্থ তুলে সমন্বয় করতে চায়।

সরকারি একটি হিসাব বলছে, বিদ্যমান দামের সঙ্গে ৪৬ শতাংশ দাম বাড়ালে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে। তবে গ্যাসের দাম ৪৬ শতাংশই বাড়ানো হবে, এমনটি নয়। ন্যূনতম ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে এই খাতে বিদ্যমান পরিস্থিতির উন্নতি করা যেতে পারে। আর গ্যাসের ভর্তুকি কমাতে দাম বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবেই।

সরকার গত তিন বছরে গ্যাসের দাম ১৩০ শতাংশ বাড়িয়েছে।এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিচালন ব্যয়, উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। সরকারের কাছে প্রস্তাব রয়েছে, গৃহস্থালি পর্যায়ে দুই বার্নার চুলার জন্য গ্যাসের দাম ৮০০ থেকে বাড়িয়ে ১২০০ টাকা করার। আর এক বার্নারের দাম ৭৫০ থেকে ১০০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। শিল্প ও সার-কারখানায় ব্যবহূত গ্যাসের দামও বাড়ানো হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে সরকার এই খাতে ভর্তুকি সমন্বয় করতে যাচ্ছে।

সূত্র বলছে, গ্যাসে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেয় সরকার। সেই ভর্তুকিটা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে দাম বাড়িয়ে সরকারের হয়তো মুনাফা হবে না। গ্যাসের অবস্থা পূরণ করার জন্য উচ্চ ব্যয়ে এলএনজি নিয়ে আসছে সরকার। বেসরকারি খাতের সামিটও এলএনজি আমদানি শুরু করেছে। সরকার এই এলএনজি উচ্চমূল্যে কিনে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবে। এলএনজি আনার জন্য বাড়তি একটি খরচ যাচ্ছে।

জানা গেছে, সরকার গৃহস্থালি পর্যায়ে গ্যাসের দাম যা বাড়াবে তার থেকে বেশি বাড়াতে চায় শিল্প ও বাণিজ্য পর্যায়ে। এজন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। সরকারের সূত্র বলছে, গ্যাসের দাম কিছুটা বাড়লেও ব্যবসায়ীরা মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন। তবে তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ চান। একই সঙ্গে গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ নিশ্চিত করারও দাবি জানান তারা। সরকার অবশ্য বলছে, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে না। সমন্বয় করা হচ্ছে। ভবিষ্যতেও সমন্বয় অব্যাহত থাকবে। কারণ সরকার ভর্তুকি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। অবশ্য ব্যবসায়ীরা যদি রাতে শিল্প চালু রাখতে চায় তাহলে বিশেষ ট্যারিফের ব্যাপারের চিন্তা-ভাবনা করা হবে।

জানা গেছে, ২০১০ সালের সরকার জ্বালানি খাতে একটি মাস্টারপ্ল্যান করে। যাতে ২০২১ ও ২০৪১ সালের গ্যাসের চাহিদা নিরূপণ করা হয়। এতে সহযোগিতা করে জাইকা। কোন জ্বালানি দিয়ে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, তার বিস্তারিত রয়েছে। ক্যাপটিভ পাওয়ারের সমালোচনা চলছে সরকারের অভ্যন্তরে। যে পরিমাণ গ্যাস দিয়ে একটি ক্যাপটিভ জেনারেট ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, একই পরিমাণ গ্যাস পাওয়ার প্লান্টে টার্বাইনে ব্যবহার করলে ৫৫ শতাংশ বিদ্যুৎ দেবে। এ কারণে ক্যাপটিভকে নিরুৎসাহিত করতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। সরকার গত মঙ্গলবার বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড করেছে, যার পরিমাণ ১২ হাজার ২৫৭ মেগাওয়াট। আর উৎপাদন সক্ষমতা ২২ হাজারের কাছাকাছি।

তবে বিশেষজ্ঞরা উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি না করে গ্যাস কূপ খনন করার পরামর্শ দিয়ে আসছেন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের সমালোচনা মানতে নারাজ সরকার। কারণ গ্যাস কূপ খনন সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। একটি গ্যাস কূপ খনন করতে ৯-১৬ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়। গ্যাস ওঠানো, বিতরণ হিসাব তা অনেক সময় লাভজনক হয় না।

পূর্বাচলে গ্যাস কূপ পেয়েও সেটা খনন করা হয়নি। কারণ খরচ বেশি। তারপরও ১০৮টি কূপ খননের পরিকল্পনা আছে। সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে ৬টি ব্লক কনকোফিলিপসকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম কমে যাওয়ায় তারা চলে গেছে। গভীর সমুদ্রে গ্যাস পেলেও তা আনতে ৮ বছর সময় লাগবে।

দাম বাড়িয়ে সরকার ব্যবসায়ীদের একটি পরামর্শ দিতে চায়। যেখানে সেখানে বিনিয়োগ করে গ্যাস-বিদ্যুৎ চাইলে দেওয়া হবে না ভবিষ্যতে। বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল করা হচ্ছে। সেখানে গ্যাস-বিদ্যুতের সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। চাইলে বিদ্যমান শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থানান্তর করে ব্যবসায়ীরা সুবিধা নিতে পারে।

জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে গ্যাস-বিদ্যুতের ১২ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। অনেক নামিদামি প্রতিষ্ঠানের বিল বকেয়া আছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিসিসিআই সভাপতি ওসামা তাসীর বলেন, গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে ১০২ শতাংশ গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে শিল্প খাতে ১৩২ শতাংশ, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯৬ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ২০৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধির হার কার্যকর হলে শিল্প খাতের উৎপাদন খরচ বাড়বে।

তিনি বলেন, বিশেষ করে সার, বস্ত্র, ডেনিম, তৈরি পোশাক, সিমেন্ট, স্টিল খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন হবে। শিল্পের স্বার্থে স্বল্পমূল্যে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে এলএনজির মূল্য নির্ধারণের ওপর গবেষণা পরিচালনা করা জরুরি।

আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নিভর্রতাকে ঝুঁকি মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া সিস্টেম লস কমানো এবং ৩-৫ বছরমেয়াদি জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ রয়েছে ব্যবসায়ীদের। সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৯৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ বাড়বে। পাশাপাশি টেক্সটাইল, সিমেন্ট ও স্টিল খাতে যথাক্রমে ১৮ দশমিক ০৬ শতাংশ, ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং ৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সম্প্রতি জানান, সরকার ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য উদার। বেসরকারি খাতের জন্য সব করা হবে। তবে যেখানে সেখানে শিল্প করলে আগামীতে গ্যাস বিদ্যুৎ চাইলে পাওয়া যাবে না। আমরা বিনিয়োগ বাড়াতে এবং উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল করছি। এছাড়া গ্যাস ও বিদ্যুৎ যাতে নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন হয়, সেটি ব্যবসায়ীদের দাবি। আমরা সেদিকে যেতে চাই।

Download Best WordPress Themes Free Download
Download WordPress Themes
Download Nulled WordPress Themes
Download Nulled WordPress Themes
online free course