ঘুম-বিশ্রাম নেই চিকিৎসক-নার্সের

এদিকে আসন্ন ঈদুল আজহার আগে সারা দেশে ডেঙ্গু আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ আতঙ্কে একটু গা গরম হলেই মানুষ ছুটছেন হাসপাতালে। তাদের অনেকের ডেঙ্গু ধরাও পড়ছে। পরে তাদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবার আওতায় থাকতে হচ্ছে। এসব নিয়ে ডেঙ্গু রোগীর কারণে বিশ্রাম এবং ঘুম হারাম হয়ে গেছে সারা দেশের চিকিৎসক, নার্স, এমএলএসএস, ওয়ার্ড ইনচার্জ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের।

রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশে মারা গেছেন ৮৬ জন; যদিও সরকারি হিসাব তা বলছে না।

এদিকে আসন্ন ঈদুল আজহার আগে সারা দেশে ডেঙ্গু আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ আতঙ্কে একটু গা গরম হলেই মানুষ ছুটছেন হাসপাতালে। তাদের অনেকের ডেঙ্গু ধরাও পড়ছে। পরে তাদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবার আওতায় থাকতে হচ্ছে। এসব নিয়ে ডেঙ্গু রোগীর কারণে বিশ্রাম এবং ঘুম হারাম হয়ে গেছে সারা দেশের চিকিৎসক, নার্স, এমএলএসএস, ওয়ার্ড ইনচার্জ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের।

ডেঙ্গুর হাত থেকে রোগীদের প্রাণে বাঁচাতে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তারা। এমনও দেখা গেছে, হাসপাতালেই তাদের খাওয়া, নাওয়া এবং বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। নিজ বাসাবাড়ি বা পরিবারের সন্তানদের সান্নিধ্য পাচ্ছেন না তারা। তারপরও নিরলস সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে একটি ধর্মীয় উৎসব সমাগত। এখানেও ঠিক মন বসাতে পারছেন না তারা। যদিও চিকিৎসাসংশ্লিষ্টদের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা থাকছে। তবু তারা সার্বক্ষণিক ব্যস্ত ডেঙ্গু প্রশমনে, রোগীদের ডেঙ্গু থেকে মুক্ত করতে।

রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, বিএসএমএমইউ হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের অমানুষিক পরিশ্রম করতে দেখা গেছে। এমনও দেখা গেছে, শয্যার চেয়ে দশগুণ বেশি ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডেও বিছানা ছাড়া মেঝেতে, করিডোরে রেখে চিকিৎসা চলছে ডেঙ্গু রোগীর। রাজধানীর অন্যান্য সরকারি ও প্রাইভেট হাসপাতালেও একই দৃশ্য দেখা গেছে। রাজধানীর বাইরের বিভাগীয় এবং জেলা হাসপাতালগুলোতেও ডেঙ্গু সন্দেহে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। চাপ রয়েছে অন্যান্য রোগীরও।

অপরদিকে, পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের হেল্প ডেস্ক খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ৬ আগস্ট মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ডেঙ্গুর বিস্তার মোকাবেলা সংক্রান্ত আলোচনা সভায় এ নির্দেশ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা ন্যাশনাল গাইডলাইন অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া ছুটির সময় কমিউনিটি ক্লিনিকে সার্বক্ষণিক সেবা দিতে প্রয়োজনীয় জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়।

এদিকে সম্প্রতি ডেঙ্গু রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সবার ছুটি বাতিল করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢামেক হাসপাতালের মেডিসিন ও শিশু বিভাগের একাধিক চিকিৎসক ও নার্স বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের সামাল দিতে স্বাস্থ্য বিভাগের ছুটি বাতিলের ঘোষণা দিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। কিন্তু বাস্তবে শুধু মেডিসিন ও শিশু বিভাগের চিকিৎসকরাই খেটে মরছেন। অন্যান্য বিভাগে রোগীর তেমন চাপ না থাকলেও তারা ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে এগিয়ে আসছেন না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও অন্যদের কাজ করতে নির্দেশনা দিচ্ছে না। তাদের প্রশ্ন-ডেঙ্গু রোগীর সামলানো কি শুধু মেডিসিন ও শিশু বিভাগের চিকিৎসক-নার্সদেরই দায়িত্ব!

ঢামেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স কিংবা কর্মচারী কেউই এখন আর রাতের আগে বাসায় ফিরতে পারেন না। ডেঙ্গুর মৌসুম এখনো বাকি থাকায় তারা চিন্তিত। তাদের মতে, এভাবে পরিশ্রম করতে থাকলে অল্পদিনের মধ্যে প্রায় সবাই অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তখন দেশের চিকিৎসাসেবায় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স উজ্জ্বল বড়ুয়া। কাজ করছেন ডেঙ্গু রোগীদের জন্য গঠন করা ডেঙ্গু সেলে। তিনি জানান, ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত তিনি সময়মতো বাসায় ফিরতে পারতেন। কিন্তু জুলাই থেকে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ঠিক সময়ে এখন আর বাসায় ফিরতে পারছেন না। শুধু উজ্জ্বল নন। তার মতো অন্যান্য নার্স, স্টাফ, চিকিৎসকদের অবস্থাও একই। একান্ত প্রয়োজন বা অসুস্থ না হলে কেউ ছুটিও পাচ্ছেন না।

উজ্জ্বল বড়ুয়া বলেন, অতিরিক্ত কাজের চাপে আমি এখন ক্লান্ত। শেষ কবে বিশ্রাম নিয়েছি মনে নেই। এর মধ্যে আমার কয়েক সহকর্মী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ভয়ে আছি আমি না আবার অসুস্থ হয়ে পড়ি।

তিনি বলেন, এতকিছুর পরও যখন রোগী ও তার স্বজনরা বাজে আচরণ করে বা অবহেলার অভিযোগ দেয়, তখন মনে অনেক কষ্ট লাগে। কিন্তু সেগুলোকে চাপা দিয়েই আবারো নেমে পড়ি সেবায়। বাস্তবতা হলো, আমাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। সেগুলোও বোঝা উচিত। উজ্জ্বল জানান, তারা রোগীদের নিয়মিত সেবা দিলেও সামান্য ত্রুটিতেই বকাঝকা শুনতে হয়। চিকিৎসকরাও বকেন, রোগীরাও বকেন।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতালের চিকিৎসকরা ক্লান্ত এবং পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। এছাড়া হাসপাতালটির বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ও নার্স নিজেরাই ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।

একই হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক কবির আহমেদ খান বলেন, ধারণক্ষমতার চেয়ে অন্তত পাঁচগুণ বেশি রোগীর চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এর বিরাট একটি অংশ ডেঙ্গু রোগী। এই অধিক সংখ্যক রোগী সামলাতে গিয়ে ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ছেন আমাদের চিকিৎসক, নার্স থেকে সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, প্রতিদিন অসংখ্য রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। এখন আর নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই। নেই পর্যাপ্ত বিশ্রাম।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কেএম নাছির উদ্দীন জানান, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য তারা আলাদা সেল গঠন করা হয়েছে। নির্দেশনা পাওয়ার পর থেকে সব ধরনের টেস্ট ও মেডিসিন ফ্রিতে দেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গু চিকিৎসায় চিকিৎসক-নার্স থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবাই নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, কয়েকদিন ধরে রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধে একাধিক মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণের ফলে শিগগিরই ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।

Download WordPress Themes Free
Premium WordPress Themes Download
Free Download WordPress Themes
Download WordPress Themes Free
online free course