ডাকসু নির্বাচন সর্বাঙ্গীণ সুষ্ঠু হয়নি : পর্যবেক্ষণকারী শিক্ষকরা

প্রসঙ্গত, ১০ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য আবেদন করেন এবং অনুমতি পান। তার মধ্যে আটজন শিক্ষক আজ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন।

ডাকসু নির্বাচন সর্বাঙ্গীণ সুষ্ঠু হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচনে পর্যবেক্ষণকারী বিশ্ববিদ্যালয়টির আট শিক্ষক। সোমবার এক বিবৃতিতে তারা এ তথ্য জানান।

প্রসঙ্গত, ১০ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য আবেদন করেন এবং অনুমতি পান। তার মধ্যে আটজন শিক্ষক আজ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন।

বিবৃতিতে তারা বলেন, আজ ১১ মার্চ বহুল প্রতীক্ষিত ঐতিহাসিক ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ডাকসু নির্বাচন নিয়ে তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে এই নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহের সঞ্চার হয়। আমরা কয়েকজন শিক্ষক নিজ উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবামূলক পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চিফ রিটার্নিং অফিসার মৌখিকভাবে অনুমতি দেন এই বলে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে এই দায়িত্ব চাইলেই পালন করতে পারবো। আমরা সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ছাত্রদের হল এসএম হল, সূর্যসেন হল, মুহসীন হল, এফ রহমান হল, শহীদুল্লাহ্ হল এবং ছাত্রীদের হল রোকেয়া হল এবং কুয়েত মৈত্রী হল পরিদর্শন করি।

আমরা কুয়েত মৈত্রী হল থেকে পর্যবেক্ষণ শুরু করি। কারণ, আমরা শুরুতেই জানতে পারি এ হলে ভোটদানে অনিয়মের কথা। ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগে ছাত্রীরা নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা শিক্ষিকাদের কাছে ভোটদানের পূর্বে শূন্য ব্যালট বাক্স দেখতে চান কিন্তু তাদের এই ন্যায্য দাবি অগ্রাহ্য করা হয়। এতে ছাত্রীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে কেন্দ্রের পাশের কক্ষ থেকে একটি বিশেষ ছাত্র সংগঠনের পক্ষে পূরণ করা প্রচুর ব্যালট পেপার উদ্ধার করে। সেগুলোর বেশকিছু আমরাও দেখতে পেয়েছি। এরকম অবস্থায় স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়। এ ঘটনায় প্রভোস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সমর্থ না হলেও আমরা রিটার্নিং অফিসারদের লজ্জিত ও মর্মাহত দেখতে পাই।

একপর্যায়ে রোকেয়া হলে গোলযোগের খবর পাই। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, সকালে কুয়েত মৈত্রী হলের অভিজ্ঞতার পর, সরকারি ছাত্রসংগঠনের বাইরের বিভিন্ন প্যানেলের শিক্ষার্থীরা ভোটকেন্দ্রের পাশের রুমে ব্যালট পেপারের সন্ধান পান এবং সেগুলো দেখানোর জন্য কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করেন। কিন্তু সেগুলো ছিল সাদা ব্যালট পেপার। এরপর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং সরকারি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিরোধীদের ওপর চড়াও হয়। বিরোধীপক্ষের কয়েকজন আহত হন। উভয় পক্ষের উত্তেজনায় এরকম অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে রোকেয়া হলে, যার নিন্দা জানাই আমরা।

ছাত্রদের হলের ভেতরে মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। তবে ভোটকেন্দ্রের বাইরে কতগুলো অনিয়ম চোখে পড়ে–

ক. ভোটারের আইডি চেক করার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের সদস্যরাই বেশি ভূমিকা রেখেছেন এবং অনাবাসিক ছাত্রদের ভোট দিতে বাধা প্রদান ও নিরুৎসাহিত করেন তারা।

খ. ছাত্রলীগের কর্মীরা নির্বিঘ্নে চলাফেরা করলেও অন্য প্যানেলের প্রার্থী ও কর্মীরা ভোটকেন্দ্রের বাইরে বা ভোটারের সারির আশপাশে অবস্থানগ্রহণ করতে বাধাগ্রস্ত হন।

গ. ভোটকেন্দ্রের অব্যবহিত বাইরে কৃত্রিম জটলা করেন ছাত্রলীগের কর্মীরা, যাতে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া শ্লথ হয় এবং বাকিরা ভোটদানে নিরুৎসাহিত হয়।

ঘ. অনেকক্ষেত্রে বুথের ভেতরে আমরা সময় গণনা করে দেখেছি ৫ থেকে ২৩ মিনিট পর্যন্ত সময় ব্যয় করেছে কোনো কোনো ভোটার, যা ইচ্ছাকৃত মনে হওয়ারর কারণ রয়েছে।

ঙ. ভোট চলাকালেই রোকেয়া হলের সামনে একটি সংগঠনের ২০-২৫ কর্মীকে বাইকের হর্ন বাজিয়ে শোডাউন করতে দেখা গেছে, যা আচরণবিধির লঙ্ঘন।

একটি বড় অসঙ্গতি মনে হয়েছে, ব্যালট পেপারে কোনো সিরিয়াল নম্বর ছিল না। ৪৩ হাজার ভোটারের একটি নির্বাচনের ব্যালট পেপারে সিরিয়াল নম্বর না থাকাটা আমাদের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। কারণ এতে নির্বাচনের ফলাফলে গুরুতর অনিয়ম ঘটানো অনেক সহজ। কোন হলে কোন সিরিয়াল গেল, তাও ট্র্যাক রাখার উপায় থাকার কথা নয়।

পরিশেষে আমরা এটাই বলতে চাই এই বহুল প্রতীক্ষিত ডাকসু নির্বাচনের অনিয়মের ঘটনাগুলো আমাদের খুবই লজ্জিত করেছে। এ ঘটনা জনগণের কাছে পরিচালিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। এতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে, যা সার্বিকভাবে একাডেমিক পরিবেশ বিঘ্নিত করবে। এত বছর পরে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচন সফলভাবে না করতে পারার ব্যর্থতার দায়ভার প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষক সবার এবং এই ব্যর্থতা পুরো শিক্ষক সম্প্রদায়ের নৈতিকতার মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আমরা চাই এই ব্যর্থতার একটি সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা হোক। সেই সাথে এই নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করে অবিলম্বে নতুন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হোক।

বিবৃতিদাতা শিক্ষকরা হলেন- গীতি আরা নাসরীন, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ; কামরুল হাসান, অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ; ফাহমিদুল হক, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ; মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ; রুশাদ ফরিদী, সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ; কাজী মারুফুল ইসলাম, অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ; তাহমিনা খানম, সহকারী অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ ও অতনু রব্বানী, সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ।

Download Premium WordPress Themes Free
Premium WordPress Themes Download
Download Best WordPress Themes Free Download
Premium WordPress Themes Download
online free course