পত্রিকার হকার থেকে কোটিপতি, বানালেন রাজকীয় বাড়ি

বর্তমান বেতন অনুসারে ১৫ বছরের চাকরি জীবনে মাসুদের আয় হয় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা। দৈনন্দিন খরচ বাদ দিলে সঞ্চয় তেমন থাকার কথা নয়। এরপরও বর্তমানে কয়েক কোটি টাকার মালিক মাসুদ। ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এই শ্রমিকের আয়ের সঙ্গে অর্জিত সম্পদের আকাশ-পাতাল ফারাক। তেল-মবিল ও অকটেনের ওজনে নয়-ছয় করে অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি।

দৈনিক মজুরিতে কাজ করা একজন অস্থায়ী শ্রমিক মাসুদ মিয়া ওরফে মাসুক। হঠাৎ বনে গেলেন কোটিপতি। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের শ্যামলী আবাসিক এলাকায় মাসুকের রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রাজকীয় তিনতলা বাড়ি, বাড়ির ছাদে রয়েছে মিনি পার্ক।

জানা যায়, মাসুদ মিয়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের আওতাধীন শ্রীমঙ্গল মেঘনা তেলের ডিপোতে ১৫ বছর ধরে কর্মরত। অফিসের ফাইল এগিয়ে দেয়া এবং অফিস স্টাফদের চা তৈরি করে দেয়াই তার মূল কাজ। স্থানীয় এক ঠিকাদারের মাধ্যমে অস্থায়ী শ্রমিক অর্থাৎ দৈনিক মজুরিভিত্তিতে মেঘনা ডিপোতে কাজে নিয়োগ পান তিনি।

মেঘনা তেলের ডিপোতে কাজের সুযোগে তেল-মবিলের ওজনে নয়-ছয় করে অল্প সময়ে জিরো থেকে কয়েক কোটির টাকার মালিক বনে যান মাসুদ মিয়া। সেই সঙ্গে নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও মাসুদ মিয়ার আর্থিক অবস্থা ছিল করুণ। সংসার চালাতে বাইসাইকেলে বিক্রি করতেন খবরের কাগজ। তার স্ত্রী কাজ করতো মানুষের বাসা-বাড়িতে। প্রতিবেশী অনেকের বাড়িতে ধোয়ামোছার কাজ করতেন নব্য এই কোটিপতির স্ত্রী।

প্রতিবেশীরা জানান, শ্রীমঙ্গল মেঘনা তেলের ডিপোতে ঠিকাদারের মাধ্যমে দৈনিক মজুরিভিত্তিতে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে যোগ দিয়েই কপাল খুলে যায় মাসুদের। বাড়ি-গাড়ি ছাড়াও তার নামে-বেনামে রয়েছে অঢেল সম্পদ। মেঘনা তেলের ডিপোতে কাজে যোগ দিয়েই ‘আলাদিনের চেরাগ’ হাতে পেয়ে যান মাসুদ। মেঘনা তেলের ডিপো কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে তেল-মবিলের ওজনদার হিসেবে কাজ করছেন তিনি। তেলের মাপে নয়-ছয়ে দক্ষতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে কর্তৃপক্ষ তাকে দিয়ে ওজনের কাজ করান। ওপর মহলে হাত থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উঠলেও চাকরি হারাননি।

মাসুদ মিয়া ওরফে মাসুক, মেঘনা তেলের ডিপোতে দিনমজুর হিসেবে ২০০২ সালে কাজ শুরু করেন। বেশ কয়েক বছর দৈনিক মজুরি হিসেবে ৪০ টাকা পেতেন তিনি। তবে বর্তমানে পাচ্ছেন দৈনিক ৭০০ টাকা।

কিন্তু বর্তমান বেতন অনুসারে ১৫ বছরের চাকরি জীবনে মাসুদের আয় হয় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা। দৈনন্দিন খরচ বাদ দিলে সঞ্চয় তেমন থাকার কথা নয়। এরপরও বর্তমানে কয়েক কোটি টাকার মালিক মাসুদ। ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এই শ্রমিকের আয়ের সঙ্গে অর্জিত সম্পদের আকাশ-পাতাল ফারাক। তেল-মবিল ও অকটেনের ওজনে নয়-ছয় করে অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি।

হঠাৎ কোটিপতি বনে যাওয়ায় শ্রীমঙ্গল শহরে মাসুদ এখন তুমুল আলোচিত ব্যক্তি। শহরের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে সবার ওপর তার নাম। বর্তমান পরিচিতির আড়ালে হারিয়ে গেছে তার অস্থায়ী শ্রমিকের পরিচয়।

তেলের ডিপোতে কর্মচারীর কাজ করে কীভাবে মাসুদ হঠাৎ কোটিপতি বনে গেলেন জানতে চাইলে শ্রীমঙ্গল মেঘনা তেলের ডিপোর ডিএস (ডিপো সুপার) সাঈদ হোসেন বলেন, মাসুদের এই অঢেল সম্পদের রহস্য আমার জানা নেই। তেলের ডিপোতে দৈনিক মজুরিভিত্তিতে শ্রমিকের কাজ করেন মাসুদ। শুনেছি শহরে বিশাল বাড়ি বানিয়েছেন তিনি।

তবে মাসুদের আসল পরিচয় অনেকেই জানেন না। অনেকেই জানেন তিনি মেঘনা ডিপোর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি অবশ্য নিজের প্রকৃত পদবি বলতে এখন লজ্জাবোধ করেন।

হঠাৎ কীভাবে কোটিপতি হলেন জানতে চাইলে মাসুদ মিয়া ওরফে মাসুক বলেন, শ্রীমঙ্গল মেঘনা তেলের ডিপোতে দৈনিক মজুরিভিত্তিতে ১৫ বছর ধরে কর্মরত আছি। কোনোরকমে চলি ভাই। সবই তো বোঝেন। ব্যাংকে আমার অনেক ঋণ রয়েছে।

শ্রীমঙ্গল মেঘনা তেলের ডিপোতে চাকরি করে কীভাবে বাড়ি-গাড়ি বানালেন জানতে চাইলে চুপ হয়ে যান মাসুদ। অনেকটা বিব্রত অবস্থায় বলেন, ওসব বাদ দেন তো ভাই। আমার পদবি অস্থায়ী শ্রমিক অর্থাৎ রোজকামলা। কামলা দিয়েই এসব করেছি।

এদিকে তেলের ডিপোর একজন কর্মচারীর হঠাৎ কোটিপতি বনে যাওয়ার খবর শুনে অবাক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একজন দিনমজুর এত টাকার মালিক হওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক। এত পরিমাণ অর্থ কীভাবে তিনি অর্জন করলেন তা খতিয়ে দেখা উচিত।

তিনি আরও বলেন, ওই প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের সিন্ডিকেট ছাড়া এত সম্পদ বানাতে পারেন না ওই কর্মচারী। তার সঙ্গে ওই প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে। এত অল্পসময়ে একজন অস্থায়ী শ্রমিক এত সম্পদ কীভাবে বানালেন তা তদন্ত করে দেখা উচিত। পাশাপাশি এখানে দুদকের বিশেষ ভূমিকা রাখা জরুরি।

Premium WordPress Themes Download
Download WordPress Themes Free
Download WordPress Themes Free
Download Nulled WordPress Themes
download udemy paid course for free