‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’ নামের এই ভাস্কর্যটি গুজরাট রাজ্যের নর্মদা জেলায় নর্মদা নদীর তীরে দেশটির স্বাধীনতা সংগ্রামী সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের অবয়বে ৫৯৭ ফুট উঁচু ভাস্কর্যটি উন্মোচন হয়েছে গত ৩১ অক্টোবর।

বিশ্বের সর্বোচ্চ ভাস্কর্য গড়ে টালমাতাল মোদির গদি

ভারতবাসীর গর্বের জন্য স্থাপন করে এ ভাস্কর্যটি এখন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য এখন গলার কাটা হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যাচু অব লিবার্টি, ব্রাজিলের ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারকে, মিয়ানমারের গোল্ডেন জায়ান্ট আর চীনের গডেস ইন দ্য সি ভাস্কর্যকে পেছনে ফেলে বিশ্বের উঁচু ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়েছে প্রতিবেশি দেশ ভারতে। ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’ নামের এই ভাস্কর্যটি গুজরাট রাজ্যের নর্মদা জেলায় নর্মদা নদীর তীরে দেশটির স্বাধীনতা সংগ্রামী সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের অবয়বে ৫৯৭ ফুট উঁচু ভাস্কর্যটি উন্মোচন হয়েছে গত ৩১ অক্টোবর। স্থানীয়ভাবে একতা মূর্তি নামে পরিচিত এ ভাস্কর্য নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। ভারতবাসীর গর্বের জন্য স্থাপন করে এ ভাস্কর্যটি এখন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য এখন গলার কাটা হয়ে উঠেছে।

ভাস্কর্যটি নিয়ে নির্মাণের আগেই মোদি সরকার ব্যাপক প্রচারণা শুরু করে, আর উদ্বোধনের সময় ঢাক-ঢোল বাজিয়ে কাঁপানো হয় দেশ। ভারতীয়দের গর্বের জন্য এই ‘একতা মূর্তি’ গড়ে এখন তোপের মুখে পড়েছে মোদি সরকার। কারণ উন্নয়ণ তহবিল থেকে মোটা অংকের টাকা ব্যয় হয়ে গেছে সর্বোচ্চ উচ্চতার এই মূর্তি গড়ে। গর্বের বদলে এখন এই ভাস্কর্য না বানিয়ে সেই টাকা দিয়ে আর কী কী করা যেত- তা নিয়ে দেশটির সীমিত আয়ের মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছে হয়েছে ‘চুলচেরা’ আলোচনা।

জাতীয় পর্যায় ছাড়িয়ে আলোচনা-সমালোচনা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পৌঁছেছে। ব্রিটিশ এমপিরা অভিযোগ তুলেছেন, ব্রিটেনের জনগণের করের টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়া হয় ভারতের গরীব মানুষের জন্যে। ভারত সেই টাকা ভাস্কর্য বানিয়ে খরচ করছে। ভারত যদি প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে ভাস্কর্য বানাতে পারে, তবে ভারতের তো ব্রিটেনের অনুদান দরকার নেই। সুতরাং ভারতকে অনুদান দেওয়া বন্ধ করা হোক। উল্লেখ, গত কয়েক বছরে ব্রিটেন প্রায় ১১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে ভারতকে।

এছাড়া ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীন জটিলতা তীব্র হয়ে উঠছে। গুজরাট রাজ্যের নর্মদা জেলার নর্মদা নদীতে বাঁধ দিয়ে সর্দার সরোবরে ভাস্কর্য বানানোর ফলে উদ্বাস্তু হওয়া আদিবাসীদের ঠিক মতো পুর্নবাসন না করার অভিযোগ সামনে উঠে আসছে। আর সেই সরোবরে বাঁধ দিয়ে বানানো হয়েছে ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাস্কর্য। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন, মহাত্মা গান্ধির আগে তার শিষ্য প্যাটেলের মূর্তি কেনো!

পদ্মভূষণ খেতারপ্রাপ্ত ৯৩ বছর বয়সী স্থাপত্যশিল্পী রামবন সুতার এর নকশায় তৈরি হওয়া ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১৮২ মিটার যা একটি ৬০ তলা দালানের সমান। এখন এটিই বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভাস্কর্য। এটি তৈরি করতে ১৮ হাজার ৫০০ টন স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১৪ সালে এটি তৈরির কাজ শুরু হয়। প্রায় চার হাজার ব্যক্তি প্রায় চার বছর পরিশ্রম করে ব্রোঞ্জের এই ভাস্কর্যটি তৈরি করেছেন। সর্দার সরোবরে বাঁধ দিয়ে প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে এটি।

এখন ভাস্কর্য হিসেবে উচ্চতার দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীনের ‘বসন্ত মন্দিরের বুদ্ধ মূর্তি’-টি। এর উচ্চতা ১৭৭ মিটারের একটু বেশি। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে জাপানের উশিকু দাইবুৎসু বুদ্ধ মূর্তিটি। এর উচ্চতা ১০০ মিটার। আর চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে আমেরিকার বিখ্যাত ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ যার উচ্চতা ৯৩ মিটার।

সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’ নামের বল্লভভাই প্যাটেল ভাস্কর্য তৈরির এই টাকায় দেশটির কৃষিক্ষেত্রের চেহারা বদলে দেওয়া যেতো। কৃষি প্রধান দেশটিতে এ টাকায় প্রায় ৪০ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে সেচের ব্যবস্থা করা যেতো। ১৬২টি ছোট সেচ প্রকল্প মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হত। তৈরি করা যেতো ৪২৫টি ছোট বাঁধ।

এ টাকায় ঢেলে সাজানো যেতো ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও। বানানো যেতো দুটি নতুন আইআইটি ক্যাম্পাস। একটা আইআইটি তৈরির খরচ প্রায় ১,১৬৭ কোটি টাকা। কিংবা বানানো যেত দুটি অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সের (এইমস) ক্যাম্পাস। কারণ একটি ‘এইমস’ তৈরিতে খরচ প্রায় ১,১০৩ কোটি টাকা। একটি আইআইএম ক্যাম্পাস তৈরির খরচ প্রায় ৫৩৯ কোটি টাকা। ভাস্কর্য বানানোর টাকায় পাঁচটি নতুন আইআইএম ক্যাম্পাস তৈরি করা যেতো।

নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে আনা যেতে পারতো পরিবর্তনের জোয়ার। প্রায় ৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি নতুন সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করা যেতো এই টাকায়। যেখানে একটি তৈরিতে খরচ প্রায় ৫২৮ কোটি টাকা।

ভারতের মহাকাশ গবেষণায় অভাবনীয় উন্নতি করার সুযোগ ছিলো এই টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে। কেননা, নেই খরচে চালানো যেতো ছয়টি মঙ্গল অভিযান। একটি অভিযানের খরচ প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। একটি চন্দ্রাভিযানের খরচ মোটামুটি ৮০০ কোটি টাকা। তাই অনায়াসে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর অধীনে তিনটি চন্দ্রাভিযানও করা যেতো এই ভাস্কর্য তৈরির টাকায়।

বল্লভভাই প্যাটেলের ভাস্কর্য উন্মোচনকে ঘিরে নর্মদা জেলার আদিবাসী গ্রামগুলোতে দেখা দিয়েছে অসন্তোষ। আদিবাসী নেতাদের মতে, একটা সুযোগ এসেছে আদিবাসীদের একজোট হওয়ার। গুজরাত তো বটেই, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান রাজ্যে যেখানে যতো আদিবাসী গ্রাম রয়েছে, সেখান থেকে আরএসএস-বিজেপি-র সব ধ্যানধারণাকে নির্মূল করে দেওয়ার ডাক দিয়েছেন তারা। ক্ষুব্ধ স্থানীয় আদিবাসী ও কৃষকদের একটি অংশ বলছেন, ফসলের দাম পাওয়া যাচ্ছে না, চাষের পানি নেই- অথচ বিপুল অর্থ খরচ করে এই ভাস্কর্য বানানো হল।

ভাস্কর্যটির ব্রোঞ্জের পাতগুলো তৈরি হয়েছে চীনে এবং প্রায় ৩০০ চীনা কর্মী দীর্ঘদিন ভারতে অবস্থান করে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছেন। ভারতীয় গরীব মানুষের প্রাপ্য অর্থ ভাস্কর্যের পেছনে খরচ করলেও, যা বানানোর সক্ষমতা ভারতের নেই। এনিয়ে রসিকতাও চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Download Nulled WordPress Themes
Download Premium WordPress Themes Free
Download WordPress Themes
Download Nulled WordPress Themes
free download udemy paid course