মমতার জয়ে বাংলাদেশের কী লাভ, কী ক্ষতি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নেমেও মমতার মসনদে আঘাত হানতে পারেনি। মমতার দৃঢ় নেতৃত্বে তৃণমূল শুধু ক্ষমতায়ই ধরে রাখেনি, আসন (২১৩) এবং ভোট (প্রায় ৪৮%) অর্জনে রেকর্ডও গড়েছে। প্রতিবেশী এবং একই ভাষাভাষী রাজ্যটির সংগে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক গভীর। ফলে সেখানকার রাজনীতি নিয়ে এদেশেও চর্চা হয়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নেমেও মমতার মসনদে আঘাত হানতে পারেনি। মমতার দৃঢ় নেতৃত্বে তৃণমূল শুধু ক্ষমতায়ই ধরে রাখেনি, আসন (২১৩) এবং ভোট (প্রায় ৪৮%) অর্জনে রেকর্ডও গড়েছে। প্রতিবেশী এবং একই ভাষাভাষী রাজ্যটির সংগে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক গভীর। ফলে সেখানকার রাজনীতি নিয়ে এদেশেও চর্চা হয়। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের এই ফল বাংলাদেশে কী ধরনের প্রভাব ফলবে তা নিয়ে অনেকেই বিচার-বিশ্লেষণের চেষ্টা করছেন।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র হারে বাংলাদেশের কী লাভ, কী ক্ষতি:

বিশ্লেষকরা পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের বিজয়ে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতির বিচার করতে মোটাদাগে তিনটি বিষয় সামনে এনেছেন। এগুলো হলো- তিস্তা চুক্তির বাস্তবায়ান, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং দেশটির নাগরিক পঞ্জী- এনআরসি।

মমতার বিজয় এ অঞ্চলে সাম্প্রদায়িকতার মুখে লাগাম টানবে:

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় আসায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো- সাম্প্রদায়িক শক্তির পরাজয়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শক্তিশালী হলে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো উৎসাহ পেতো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ  বলেন, তৃণমূল কংগ্রেসের বিজয়ে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক একটা প্রভাব তো আছেই, কারণ বিজেপি একটি সাম্প্রদায়িক চিন্তা-ভাবনার পার্টি। সেই পার্টি পশ্চিমবঙ্গে এলে আরো ঝামেলা তৈরি হতো। সেই অর্থে তৃণমূলের জয় আমাদের জন্য আপাতত পজিটিভ।

তার মানে তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ে বাংলাদেশের লাভই হয়েছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপাতত বলা যায়, ক্ষতি হয়নি। কারণ, বিজেপি এলে পশ্চিমবঙ্গে বিশাল ঝামেলা হতো। ওখানে সাম্প্রদায়িক শক্তি বেড়ে যেতো। ভারতের সাম্প্রদায়িক শক্তি বাড়া মানেই এদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো উৎফুল্ল বোধ করতো। সেই জায়গায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মোটামুটি বিজেপিকে ঠেকিয়ে দিয়েছেন- এটা একটা বড় ঘটনা।

এই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল যে পথ দেখিয়েছে সেটির প্রভাব ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও পড়তে পারে। প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির হারে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতির বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ মো. আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী  বলেন, এটা একেবারেই ভারতের নিজস্ব ব্যাপার। অনেকগুলো বিষয় এর সংগে জড়িত। তাই সরাসরি লাভ বা ক্ষতি হয়েছে- এটা বলা যাবে না। একটা বিষয় আমরা বলতে পারি, যেহেতু তাঁরা (তৃনমূল) সেকুলারিজমটাকে রক্ষা করতে পেরেছেন, সেইটা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক। সেখানে অসাম্প্রদায়িকতা ধরে রাখতে পারাটা পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে আমাদের জন্য ইতিবাচক। আর অন্য বিষয়গুলো স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। সেটা কূটনৈতিক ব্যাপার। সেগুলো এখনি বুঝার সময় আসেনি।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসায় পশ্চিমবঙ্গের সংগে বাংলাদেশের বিদ্যমান সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকবে বলে মত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলুল হালিম রানার।  তিনি বলেন, বিজেপি বা অন্য কেউ সরকারে থাকলে যেই ধরণের শঙ্কা তৈরি হতো সেটা থাকছে না। অন্য কেউ এলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হাঙ্গামা কিংবা এক ধরণের অসহিষ্ণু পরিবেশের সম্ভাবনা তৈরি হতো। সেটা এখন হবে না। যেহেতু তৃণমূল কংগ্রেস প্রগতিশীল রাজনীতি করে, সেই জায়গা থেকে দেখা যায়, এক ধরণের স্থিতিশীলতা থাকবে এবং বাংলাদেশের সংগে এই অর্থে সুসম্পর্কই থাকবে।

তিস্তা ইস্যু:

২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় তিস্তা চুক্তি সই হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার মুখে তা আটকে যায়। এরপর ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পরের বছর অর্থাৎ, ২০১৫ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে বাংলাদেশ সফর করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে তিনি আশ্বস্ত করেন যে তিস্তার পান ভাগাভাগি নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো হবে। কিন্তু এরপর পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও তিস্তা সমস্যার কোনো সমাধান এখনো হয়নি। সবশেষ ২০১৯ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে মীমাংসা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সেটি হয়নি। সম্প্রতি নির্বাচনী প্রচারণায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় বলে দেন, তিস্তার পানি আগে খাবেন, পরে দেবেন।

নির্বাচনে জিতে মমতা আবারও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় বসায় তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আপাতত পাচ্ছে না বাংলাদেশ এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।

এ বিষয়ে অধ্যাপক ফজলুল হালিম রানা বলেন, তিস্তা চুক্তি আশার আলো দেখবে বলে আমি মনে করি না। কারণ, আমার মনে হচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস এক ধরণের স্ট্যানবাজী করে। জনগণের জন্যই তাঁরা এটা করছে- এমনটা দেখানোর জন্য হলেও (তিস্তা সমস্যার সমাধান) করবে না। তিস্তার পানি নিয়ে বাংলাদেশের সংগে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করার সুযোগ তাঁর নেই। কারণ, তাঁরা ধরেই নিয়েছে এটা করতে গেলে ভোটের রাজনীতিতে পরবর্তী নির্বাচনে তৃণমূলের অবস্থান খারাপ হবে। সে কারণে এদিকে তিনি পা দেবেন বলে আমার মনে হয় না। মোদ্দা কথা হচ্ছে তিস্তা চুক্তি হবে না।

তিস্তা ইস্যুর সংগে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি জড়িত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি ক্ষমতায় এলেই যে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো তেমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।

অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, তিস্তা দিল্লির রাজনীতির মধ্যে আটকে আছে। এটা তাঁদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়। সেটা (তিস্তা) তো আমরা অন্যভাবে সমাধান করার চেষ্টা করছি। বিশেষ করে আমাদের দেশে বাঁধ তৈরি করে পানি রাখার চিন্তাভাবনা করছি। পশ্চিমবঙ্গে কে এলো না এলো সেটার উপর নির্ভর করে এটার সমাধান হবে না। কারণ, বিজেপি এলেও একই ধরনের কথা বলা হতো। এ জন্য আমাদের অন্যপথ ধরা প্রয়োজন।

অধ্যাপক সৈয়দ মো. আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের সংগে তিস্তা ইস্যুর সমাধান করা না করা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সেটি নির্ভর করবে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার প্রাদেশিক সরকারের সংগে কীভাবে নেগোসিয়েট করবে তার ওপর। কেন্দ্রীয় সরকার তো তিস্তার বিষয়ে আমাদের সংগে একমত হয়েছে। এখন তাঁদের যেহেতু সরকার ব্যবস্থাটাই অন্যরকম, সেক্ষেত্রে তাঁরা কীভাবে রাজ্য সরকারের সংগে নেগোসিয়েট করবে সেটা একটা ব্যাপার।

তিনি বলেন, তিস্তার পানি দেওয়া না দেওয়ার ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের কর্তাব্যক্তিদের অবস্থান এবং সাধারণ জনগণের অবস্থান কিন্তু এক রকম নয়। সাধারণ জনগণের মধ্যে যারা চিন্তা-ভাবনা করেন, তাঁদের অনেকে মনে করেন, তিস্তার পানি বাংলাদেশকে না দেওয়ায় খুব একটা উপকার বা অপকার হচ্ছে না। এটা সবার বুঝতে আসলে সময় লাগবে।

ন্যাশনাল রেজিস্ট্রি অফ সিটিজেন্স (এনআরসি):

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) হতো। ফলে রাজ্যের অনেক মুসলিম বাঙালি তাঁদের নাগরিকত্ব হারাতেন। এতে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলায় অস্থিরতা দেখা দিতো। তৃণমূলের জয় পাওয়ায় সেই পরিস্থিতি হবে না।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলুল হালিম রানা বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম। আমাদের সীমান্তবর্তী যে জেলাগুলো রয়েছে যেমন- মুর্শিদাবাদ, চব্বিশ পরগনা, নদীয়, মালদা, জলপাইগুড়ি, এসব এলাকার ২৫ শতাংশের মতো মানুষ মুসলিম। এনআরসি নিয়ে এঁদের একটা শঙ্কা ছিলো। যদি বিজেপি ক্ষমতায় আসতো তাহলে এনআরসি হতো এবং এঁরা নাগরিকত্ব হারাতেন। তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় থেকে যাওয়ায় এই রাজ্যে এনআরসি হবে না। ফলে সেখানকার বাঙালি বা মুসলিমরা বেঁচে গেলেন।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যসভার নির্বাচনের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ক গবেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজ  বলেন, গত দশ বছর যাবৎ তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আছে। তারা আরো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকবে। এতে বাংলাদেশে নতুন করে কোনো প্রভাব পড়বে বলে আমার মনে হয় না। আগে যে অবস্থা ছিলো সেই অবস্থাই থাকবে।

এনআরসি’র বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ তো আগেই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, সে দেশে অবৈধভাবে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক নেই। তাই সেখানে এ বিষয়ে যাই হোক বাংলাদেশে প্রভাব পড়বে না।

পশ্চিমবঙ্গে যেই আসুক না কেন বাংলাদেশের সংগে সুসম্পর্ক বজায় থাকবে বলে মনে করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ে তিস্তা চুক্তি আবার ঝুলে যাবে কি-না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা আগের মতোই আমাদের কাজ করে যাবো। আমাদের কোনো সমস্যা হবে না।

Download Nulled WordPress Themes
Download Premium WordPress Themes Free
Download Nulled WordPress Themes
Download Premium WordPress Themes Free
download udemy paid course for free