অতিরিক্ত ভ্রমণকারী এবং তাদের যথেচ্ছাচারের কারণে নষ্ট হচ্ছে রাতারগুলের বনের পরিবেশ, নষ্ট হচ্ছে গাছপালা, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। তাই ভ্রমণে আনন্দের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় সচেষ্ট থাকা একান্ত কাম্য।

রাতারগুলের জলাবনে

Ratargul_Swamp_Forest,_Sylhet.

জলাবন—বনেরই আরেক রূপ, যেখানে পানিসহিষ্ণু গাছপালা স্বল্প পানিতে বেড়ে উঠে বন তৈরি করে। এই জলাবনগুলো সাধারণত মোহনা অঞ্চলে স্বল্প লবণাক্ত পানিতে হয়ে থাকে। খুব অল্পসংখ্যক আছে স্বাদুপানির বন, সিলেটের রাতারগুল তার মধ্যে একটি। সিলেট শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরত্বে গোয়াইনঘাটে এটির অবস্থান।

রাতারগুলের এই জলাবন নষ্ট হতে হতে বর্তমানে মাত্র দুই বর্গকিমির মতো জায়গাজুড়ে রয়েছে। যদিও একটি বিশাল এলাকাকে ১৯৭৩ সালে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। বর্ষায় এই বনের গাছগুলো আংশিক জলে ডুবে থাকে। তাই এই সময় এই জলাবন ভ্রমণ করলে আপনি পেতে পারেন বনের এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। বৃষ্টির পানি, আশপাশের নদী ও খালের পানি এখানে চলে এসে বেশ বড় জলাশয়ের সৃষ্টি করে। গাছের গোড়া ডুবে যায় পানিতে, আর সেই পানিতে গাছের উপরের অংশের সবুজের প্রতিফলন ঘটে পুরো বনটিকে সবুজ করে তোলে। সেই সাথে সাদা মেঘ আর নীল আকাশ যোগ করে অন্য এক মাত্রা। তাই অন্য সব বনের মতো হেঁটে নয়, এই বনে আপনাকে ঘুরতে হবে নৌকা দিয়ে। বর্ষা শেষে পানি নেমে গেলে কিছুদিন কাদা হয়ে থাকে বন, তখন সেটা ভ্রমণের অনুপযোগী হয়ে যায়। তবে আবার শীতকালে এই বন পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানো যায়। চাইলে একটা রাত ক্যাম্পিং করেও কাটাতে পারেন এখানে।

রাতারগুলের এই জলাবন প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হলেও বাংলাদেশ বন বিভাগও এখানে নানা জাতের জলসহিষ্ণু গাছ লাগিয়েছে। এখানে দেখতে পাবেন হিজল, অর্জুন, জারুল, কদম, বটগাছ, বেত গাছসহ পানিসহিষ্ণু অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এই জলাবনে রয়েছে নানা জাতের সাপের আবাস। বর্ষায় বনের ভেতর পানি ঢুকলে এসব সাপ গাছে অবস্থান নেয়। গাছে গাছে চোখে পড়তে পারে বানর বা বক, মাছরাঙা, টিয়া, বুলবুলি, পানকৌড়ি ইত্যাদি পাখি।

রাতারগুলে পৌঁছে ঘণ্টা হিসেবে নৌকা ভাড়া করতে হবে। নৌকার মাঝিই জলাবনের ভেতর দিয়ে আপনাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে। দেখবেন বনের বৈচিত্র্যময় রূপ। হালকা মৃদুমন্দ বাতাসে ধীরে ধীরে নৌকা নিয়ে আগানো, গাছে গাছে অচেনা পাখির ডাক, যেকোনো মুহূর্তে কোনো একটা গাছের ডাল থেকে সবুজ একটা সাপ আপনার ঘাড়ে গিয়ে পড়তে পারে; সেই শঙ্কায় দুরু দুরু মন, মাঝির গলায় প্রিয় কোনো পল্লিগীতি—সব মিলিয়ে দারুণ একটা সময় উপহার দেবে আপনাকে।

বনের মাঝে আছে একটি ওয়াচ টাওয়ার। এটির উপরে উঠে চারপাশের প্যানারমিক দৃশ্য দেখতে পাবেন। তবে এই টাওয়ারটি অনেক পুরানো এবং মেরামতের অভাবে এটি বিপজ্জনক। একসাথে অনেক বেশি মানুষ এই টাওয়ারে উঠলে এটি ভেঙে পড়ে যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা আছে। তাই একসাথে বেশি মানুষ দেখলে এটি এড়িয়ে যাওয়াই ভালো হবে।

বিগত কয়েক বছরে রাতারগুলের জলাবন ভ্রমণপ্রিয়দের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পর্যটনের দিক দিয়ে এটা ভালো হলেও অতিরিক্ত ভ্রমণকারী এবং তাদের যথেচ্ছাচারের কারণে নষ্ট হচ্ছে রাতারগুলের বনের পরিবেশ; নষ্ট হচ্ছে গাছপালা; ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। তাই ভ্রমণে আনন্দের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় সচেষ্ট থাকা একান্ত কাম্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Download Premium WordPress Themes Free
Download WordPress Themes Free
Download WordPress Themes
Download WordPress Themes Free
online free course