রোয়াইঙ্গারা জটিল কূটনীতিক সমস্যায় ফেলছে বাংলাদেশকে

৪২ হাজার রোয়াইঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিলো কে? প্রশ্নটির উত্তর হল, আমি প্রায় শতাধিক বাংলাদেশী সৌদী প্রবাসীদের সাথে বিভিন্ন মাধ্যমে কথা বলে জেনেছি যে,  বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারাই এ পাসপোর্ট দেন। বাংলাদেশী প্রবাসীরা অভিযোগও করেছেন,  একটা পাসপোর্ট রি-নিউ করতে আমাদের কাছে তারা টাকা পায় রাষ্ট্র নির্ধারিত ফিসে। আর একজন রোয়াইঙ্গা দালাল ধরে চড়া দামে পাসপোর্ট রি-নিউও করে,পাসপোর্ট ম্যানেজও করে। তাদের তুলনায় আমাদের সাথে বাংলাদেশ দূতাবাস আচরণ করে তা খুবই অমানুষিক। কারণ আমাদের কাছে টাকা কম পায়।

তানভিরুল মিরাজ রিপন

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবচে বড় ব্যর্থতা বাংলাদেশের সীমান্তগুলোতে কাঁটাতার দিয়ে ঘেরাও করতে না পারা। অতিমানবিক মানুষগুলো হয়ত রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিশ্বাস না করে পুরো বিশ্বকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। এটির ধারনা,প্রেক্ষাপট, প্রয়োগ একটি জটিল প্রক্রিয়া। এ পৃথিবীতে  যখন একটি রাষ্ট্রে পরিনত হবে সেদিন আরও সংঘর্ষ বাড়বে। যাক সে কথা, প্রসঙ্গ হল ‘রোয়াইঙ্গা’দের নিয়ে।২০১৬ সালের দিকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের একটি বৈঠকে টিভি চ্যানেলের  সংবাদকর্মী হিসেবে বেশ কয়েকটি মাসিক নিরাপত্তা বৈঠকে বসার সুযোগ হয়েছিল। সে সব মিটিংয়ে রোয়াইঙ্গারা বাংলাদেশের সীমান্ত পার হয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করার ঘটনা নিয়ে কথা বলত। বিভিন্ন জনে পরামর্শ দিতেন। সংসদ সদস্য,রাজনৈতিক নেতা,মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠক,সামাজিক সংগঠনের নেতা,সাংবাদিক নেতারা উপস্থিত থেকে মন্তব্য এবং পরামর্শের কথা জানাতেন জেলা প্রশাসককে।

তারা সেসময় থেকে জেলা প্রশাসককে বলেছেন এখনও বলেন মায়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা এদেশে রোহিঙ্গাদের পুশ করেন। ফাঁকফোকরও দেখিয়ে দেন। খাবারও দেন বিজিপি। যদি আমাদের দেশের সীমান্তরক্ষীদের চোখে পড়ে তাহলে পুশব্যাক করেন। কিন্তু তারা আবার চলে আসেন ফাঁকি দিয়ে রাতের গভীরে, দিন দুপুরে। এটা থামানোর জন্য কাঁটাতারের ব্যবস্থা করতে বলেছেন। তার ব্যবস্থা আসলেই এখনও হয়নি। হওয়ার সম্ভাবনাও কম। আমাদের দেশের সীমান্তরক্ষী বিজিবির গাফেলতি একটুও নেই। তাঁরাও মানুষ। দ্বায়িত্ব পালন করেন, মাঝে মাঝে আবেগীও হন। এটির সমাধান কক্সবাজারের বিশিষ্ট জনেরা চেয়েছিলেন জেলাপ্রশাসকের কাছে। জেলা প্রশাসক আদৌও সেসব সমস্যা সমাধান করার আগ্রহী কি না সেটিও প্রশ্ন।

দ্বিতীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ, রোয়াইঙ্গাদের সাথে কোনো ধরনের সামাজিক সম্পর্ক তৈরী না করা। প্রশাসনকে এ বিষয়ে কঠোর হওয়ার অনুরোধও করেছেন। এরপরও প্রশাসনের কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এখনও ইউপি চেয়ারম্যানরা অভিযুক্ত হোন রোয়াইঙ্গাদের জন্ম-নিবন্ধন দেওয়ার অভিযোগে। সামাজিক সম্পর্ক বিয়ে,ব্যবসাতো অহরহ করছে বাংলাদেশীদের সাথে রোয়াইঙ্গারা।

পুরো দেশকে ইয়াবাতে ভরপুর করেছে রোয়াইঙ্গারা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করছে। তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগটি হল,রামু ট্রাজেডিতে যারা মন্দিরও মানুষের ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে তারা বেশির ভাগ রোয়াইঙ্গা ছিলো। কক্সবাজারের ৫০ জন বিশিষ্ট জনের ওপর হামলার ছকও রোয়াইঙ্গারা করেছে। এ জন্য অনেকের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, কাঁচ কলা হাতে ধরিয়ে দিয়ে প্রত্যেকদিন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে রোয়াইঙ্গারা। সন্ত্রাসী গ্রুপও সক্রিয়, মাফিয়া,আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সাথেও যোগাযোগ রয়েছে বলেও ধারনা অনেকের।

২০১৭ সালের জুলাই মাসে আমি বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডে সহযোগিতায় বাংলাদেশ মায়ানমারের সীমান্ত ও নো-ম্যানস ল্যান্ডে পা রেখেছিলাম, ঘুমধুম,তুমব্রু সীমান্তবর্তী মানুষের সাথে কথা বলে জেনেছি যে তারা জানেনা বাংলাদেশ সীমান্ত কতখানি। কোথায় শেষ। ওরা জানে যে মায়ানমারের কাঁটাতার পর্যন্ত সীমান্ত। তারা জানেই না তিনশোগজ নো-ম্যানস ল্যান্ড। সে সীমান্ত ঘেঁষে অনেকে চাষ করে ধান,বাদাম,আলুসহ নানান শস্য। ২০১৯ এ আবার দ্বিতীয় পর্যায়ে সীমান্ত পাশবর্তী মানুষগুলোর জীবন যাপন দেখতে গিয়েছি। অর্থনৈতিক অবস্থা আরও নাজুক হয়েছে তাদের। কাঁটাতার এখনও ওঠেনি। বিয়ে রোয়াইঙ্গাদের সাথে এখনও হয়। তবে কম।

২০১৬ সালের পুরো বর্ষায় রোয়াইঙ্গারা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। সমুদ্র পথে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। দালালদের চক্রে পড়ে, লোভে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার মাঝপথে তারা আধমরা হয়ে যায়, মরে যায়। বিশ্ব মিডিয়া তাদের ঢালাওভাবে প্রচার করে বাংলাদেশী বলে। দুদিন আগেও সেন্টমার্টিনে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে ট্রলার ডুবে৷ বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে পরিচয় করিয়েছে মানবপাচারের একটি অভয়ারণ্য হিসেবে।দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে বিশ্বের কাছে।

সম্প্রতি সৌদি এরব ঘোষণা  দিয়েছে ৪২ হাজার রোয়াইঙ্গাদের ফেরত পাঠাবে বাংলাদেশে। কেনো পাঠাবে?  কি কারনে পাঠাবে তার একটি গভীর রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ আছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। সংঘর্ষ রাজনীতির বড় ফায়দা ঘুরে দাড়াবে বাংলাদেশের কক্সবাজারে। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের বিবর্তন হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাংলাদেশ-রাখাইনে। চীনের যে সমুদ্র দখল কেন্দ্রীক ব্যবসা পরিকল্পনা সেটিকে হস্তগত করার উদ্দেশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মিত্র সৌদি আরব। মায়ানমারের রোয়াইঙ্গাদের মাঝে তালেবানি,আইএসর মতো সন্ত্রাসীদের সংগঠিত করে, সন্ত্রাসী তাড়ানোর নাম দিয়ে সংঘর্ষ প্রবন এলাকায় পরিণত করতে চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেটির বড় যোগানদার সৌদি আরব। আরও কারণ আছে,সৌদি এরবে ইয়েমেন যুদ্ধের জন্যসহ পাক নিরাপত্তা সহায়তা চুক্তির নামে ১০০০ সৈনিক পাকিস্তান পাঠিয়েছে পাকিস্তান। কিন্তু পাক-চীন সম্পর্কের কারনে সৌদিআরব সরে আসতে চায়। কারন সৌদি আরব সব সময় মার্কিন জোটেরই মিত্র। তারা পাকিস্তান থেকে সরে এসে বাংলাদেশ থেকে চুক্তির মাধ্যমে ১৮০০ সৈনিক পাঠাচ্ছে বাংলাদেশ । নিরাপত্তার চুক্তি ও মুসলিম দেশ ও মিত্র হওয়ার পরও রোয়াইঙ্গাদের মায়ানমার পাঠিয়ে দেওয়ার কথা না বলে কেন বাংলাদেশে পাঠাবে বলছে? সম্পর্ক নয় আন্তর্জাতিক কূটকৌশল আমাদের আরও রপ্ত করতে হবে এবং এজেন্ডা তৈরী করতে হবে।

৪২ হাজার রোয়াইঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিলো কে? প্রশ্নটির উত্তর হল, আমি প্রায় শতাধিক বাংলাদেশী সৌদী প্রবাসীদের সাথে বিভিন্ন মাধ্যমে কথা বলে জেনেছি যে,  বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারাই এ পাসপোর্ট দেন। বাংলাদেশী প্রবাসীরা অভিযোগও করেছেন,  একটা পাসপোর্ট রি-নিউ করতে আমাদের কাছে তারা টাকা পায় রাষ্ট্র নির্ধারিত ফিসে। আর একজন রোয়াইঙ্গা দালাল ধরে চড়া দামে পাসপোর্ট রি-নিউও করে,পাসপোর্ট ম্যানেজও করে। তাদের তুলনায় আমাদের সাথে বাংলাদেশ দূতাবাস আচরণ করে তা খুবই অমানুষিক। কারণ আমাদের কাছে টাকা কম পায়।

দোষ বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের। ৪২হাজার রোয়াইঙ্গাদের পাসপোর্ট যদি তারা না দিয়েও থাকে। রি-নিউও করিয়েতো মেয়াদ বাড়িয়েছে। তারাই দেশের প্রবাসীদের শ্রমবাজার হত্যা করেছে। রোয়াইঙ্গারা বাংলাদেশি সেজে ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে।

সমাধান আছে? দেশের ১৪ লাখের মত রোয়াইঙ্গা।আরও ৪২ হাজার রোয়াইঙ্গাদের ভার কম কিছু?  স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় কাঁটাতার তুলবে না। ক্যাম্পে সংগঠিত হওয়া সন্ত্রাসী গোষ্টীদের ধরতে ব্যর্থ হবে। বাংলাদেশ দূতাবাস রোয়াইঙ্গাদের পাসপোর্ট দিবে। এগুলোর চেয়ে বড় সমাধান আছে?

Download WordPress Themes
Download Best WordPress Themes Free Download
Premium WordPress Themes Download
Premium WordPress Themes Download
free download udemy course