বিশেষ সংবাদ Archives - Page 3 of 3 - Dhaka Today

dhaka-big-20180916182741.jpg

রাজধানীসহ সারাদেশে পরিবেশ দুষণ বাড়ছে। আর দূষণ রোধে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সুফল পাচ্ছে না মানুষ। অন্যদিকে পরিবেশ দূষণের কারণে প্রতি বছর ক্ষতি হচ্ছে ৫২ হাজার কোটি টাকা।

বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রতিবছর পরিবেশ দূষণে বাংলাদেশে ৫২ হাজার কোটি টাকার (৬.৫ বিলিয়ন ডলার) ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতি বাংলাদেশের ৩ দশমিক ৪ শতাংশ জিডিপির সমান।

রোববার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সোনারগাঁ হোটেলে এই প্রতিবেদন তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর রাজশ্রী পার্লকার। বাংলাদেশের দূষণ নিয়ে ‘ইনহ্যান্সিং অপারচুনিটিজ ফর ক্লিন এন্ড রেসিডেন্ট গ্রোথ ইন আরবান বাংলাদেশ, কান্ট্রি এনভারমেন্ট এনালাইসিস ২০১৮’ শিরোনামে করা প্রতিবেদনটিতে এই তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিবেশ দূষণের কারণে বাংলাদেশে ৫২ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। এছাড়া বিশ্বে যেসব মানুষ মারা যান তার ১৬ শতাংশ পরিবেশ দূষণের কারণে। আরও বাংলাদেশে এই হার ২৮ শতাংশ।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের চেয়ে শহরাঞ্চলে দূষণের মাত্রা বেশি। ২০১৫ সালে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে ৮০ হাজার মানুষ পরিবেশ দূষণের কারণে মারা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অনুষ্ঠানে বন ও পরিবেশমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, আমরা পরিবেশ দূষণ নিয়ে সচেতন। আমরা এ বিষয়ের ২১০০ সালের ডেল্টা প্লান হাতে নিয়েছি। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টির কথা মনে রাখতে হবে।

তিনি বলেন, ঢাকা শহরের বায়ূ দূষণের ৫৮ শতাংশ হয় ইট ভাটা থেকে। আমরা একটি পরিবেশ আইন করতে যাচ্ছি। সেটি বাস্তবায়ন হলে ইটভাটা এভাবে আর গড়ে উঠতে পারবে না। এছাড়া আইনের বাইরেও জনসাধারণকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর রাজশ্রী পার্লকার, বন ও পরিবেশমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ছাড়াও বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

d2.jpg

৫ বছর আগে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান আমলে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের বহরে আসে জিএম বি১২ মডেলের ৪০টি ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ)। এরপর পাকিস্তান ভেঙে জন্ম হয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু ৬৬ বছরের সেই পুরোনো ইঞ্জিন এখনো এ দেশের রেলপথে চলছে। চলছে বলতে চালানো হচ্ছে। কারণ, বেশির ভাগ ইঞ্জিনের মেয়াদ চলে গেছে। মেরামত করে জোড়াতালি দিয়ে বুড়ো সেসব ইঞ্জিন দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে।

রেলের এক প্রকৌশলীর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল মোটরসের তৈরি এই ধরনের ইঞ্জিন বিশ্বের বহু দেশে এখন জাদুঘরে রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই ইঞ্জিন মালামাল পরিবহনের কাজ দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে যাত্রী বহনও করতে হয়। এর বাইরেও এ রকম অর্ধশত বছরের পুরোনো ইঞ্জিন দিয়ে যাত্রী পরিবহনের কাজ চলছে। পুরোনো হওয়ায় এগুলো প্রায়ই বিকল হয়ে যায়। সেগুলোর যন্ত্রাংশও সহজে পাওয়া যায় না।

রেল কর্তৃপক্ষের মতে, একটি ইঞ্জিনের ইকোনমিক লাইফ বা কার্যক্ষমতা থাকে ২০ বছর। ১৯৭৩ সালে কার্যক্ষমতা চলে গেলেও ৪৬ বছর ধরে চলছে এসব ইঞ্জিন। কেবল বি১২ মডেলের ইঞ্জিন নয়, বাংলাদেশ রেলওয়ে বহরে মোট ২৭৩টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১৯৫টি ইঞ্জিন এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। মাত্র ৭৮টি ইঞ্জিনের মেয়াদ আছে।

ইঞ্জিনসংকটে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক প্রথম আলোকে বলেন, তিনি প্রথম আলোর সঙ্গে এ নিয়ে কোনো কথা বলতে চান না। তিনি বলেন, ‘আপনি টেলিফোন করেছেন, জানতে চাইছেন, আমি কথা বলব না—এ কথা লিখে দেন।’

 

 

তবে রেলমন্ত্রী জবাব না দিলেও বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন প্রথম আলোকে জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, রেলবহরে ১৪০টি নতুন ইঞ্জিন ২০২০ সালের পর থেকে আসা শুরু হবে। এসব নতুন ইঞ্জিন চলে এলে সংকট কেটে যাবে। তিনি আরও বলেন, ১০টি নতুন ইঞ্জিন ২০২০ সালের শুরুর দিকে আসা শুরু হবে। আরও ৭০টি ইঞ্জিন কেনার বিষয় মন্ত্রিপরিষদ সভায় পাস হয়েছে। সেগুলো ২০২১ সাল থেকে আসা শুরু হবে। আরও ২০টি ইঞ্জিন কেনার জন্য ঋণচুক্তি হয়েছে। এ ছাড়া ৪০টি ব্রডগেজ ইঞ্জিন কেনার জন্য দরপত্র হয়ে গেছে।

রেলের ভরসা ৭৮টি ইঞ্জিন
ব্রডগেজ ও মিটারগেজ মিলিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়েতে বর্তমানে রয়েছে ২৭৩টি লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন। এর মধ্যে ব্রডগেজ ইঞ্জিন রয়েছে ৯৪টি। বাকি ১৭৯টি রয়েছে মিটারগেজ ইঞ্জিন। মিটারগেজ ইঞ্জিনের মধ্যে ৪৫টি ইঞ্জিনের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছর, ৩১টি ইঞ্জিনের বয়স ৩১ থেকে ৪০ বছর এবং ৬৪টি ইঞ্জিনের বয়স ৪১ বছর থেকে ৬০ বছরের বেশি। সব মিলিয়ে ১৭৯টি মিটারগেজ ইঞ্জিনের মধ্যে ১৪০টি মেয়াদোত্তীর্ণ। আর ৯৪টি ব্রজগেজ ইঞ্জিনের মধ্যে ২৪টির বয়স ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। ৩১টি ব্রডগেজ ইঞ্জিন ৪১ বা তারও বেশি বছর পার হয়ে গেছে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ব্রডগেজ ও মিটারগেজ মিলিয়ে ৭২ শতাংশ মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে চলছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। মিটারগেজ ও ব্রডগেজের ৩৯টি করে মোট ৭৮টি ইঞ্জিনের কার্যদক্ষতা রয়েছে।

রেলওয়ে বহরে ২৭৩টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১৯৫টি এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। ছবি: আবদুস সালাম

ইঞ্জিন কমছে
কয়লাচালিত ইঞ্জিনের পাশাপাশি ১৯৫৩ সালে তৎকালীন ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলবহরে প্রথমবারের মতো আসে ডিজেলচালিত জিএম বি১২ মডেলের ৪০টি ইঞ্জিন। এসব ইঞ্জিন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল মোটরস। সড়কপথে যোগাযোগব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় ট্রেনই ছিল এ দেশে মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। যাত্রী চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রেলবহরে ইঞ্জিনের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের আগে ১৯৬৯-৭০ অর্থবছরে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়েতে ছিল ৪৮৬টি ইঞ্জিন। এর মধ্যে কয়লাচালিত ইঞ্জিন ছিল ৩৪৩টি, ডিজেল ইঞ্জিন ছিল ১৪৩টি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ রেলওয়েতে কয়লাচালিত ইঞ্জিন কমতে কমতে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু কয়লাচালিত ইঞ্জিন বিলুপ্ত হওয়ার পর সে অনুপাতে সেই স্থানে যুক্ত করা হয়নি ডিজেলচালিত ইঞ্জিন। যাত্রীর চাপ অনুসারে ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের সংখ্যা বাড়েনি। বরং একটি পর্যায়ে এসে কমেছে। গত ১০ বছরে রেলে প্রায় দুই কোটিরও বেশি যাত্রী বাড়লেও সেই অনুসারে বাড়েনি ইঞ্জিন। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়েতে ইঞ্জিন ছিল ২৮৬টি। ওই বছর রেলে যাত্রীসংখ্যা ছিল পাঁচ কোটি ৩৮ লাখ ১৬ হাজার। ২০০৯-১০ পর্যন্ত ইঞ্জিনসংখ্যা একই ছিল। ২০১০-১১ অর্থবছরে রেলে ইঞ্জিনসংখ্যা কমে হয় ২৫৯। ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩৬টি নতুন ইঞ্জিন যুক্ত হয়ে ইঞ্জিনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৯৫। তবে পরের ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৩৭টি পুরোনো ইঞ্জিন বাতিল করা হলে ইঞ্জিনসংখ্যা দাঁড়ায় ২৫৮। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে নতুন আরও ৩৫টি ইঞ্জিন যুক্ত হয়ে রেলওয়েতে ইঞ্জিনসংখ্যা হয় ২৮২টি। এর পরের দুটি অর্থবছরে রেলওয়েতে ইঞ্জিন কমতে থাকে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২৭৮টি এবং সবশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রেলওয়েতে ইঞ্জিনসংখ্যা কমে হয় ২৭৩।

যাত্রীসংখ্যা ওঠানামা করছে
যাত্রীর সঙ্গে খাপ খাইয়ে ইঞ্জিনের মতো রেলের কোচ বা বগির সংখ্যা সে অনুযায়ী বাড়েনি। ১৯৬৯-৭০ সালে রেলে কোচ ছিল ১১৬৫টি এবং যাত্রী ছিল ৭ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৭৬টি কোচে ৬ কোটি ৪৯ লাখ ৫৮ হাজার, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৭৪টি কোচে ৬ কোটি ৭৩ লাখ ৪২ হাজার যাত্রী ট্রেনে ভ্রমণ করেছেন। ২০১৫-১৭ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রেলে কোচের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ২১৮ ও ১ হাজার ৩৮১টি। ওই দুই বছর রেলে যাত্রীসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৮ লাখ ৩১ হাজার এবং ৭ কোটি ৭৮ লাখ ৭ হাজার।

জোড়াতালির মাধ্যমে বুড়ো ইঞ্জিন দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। ছবি: আবদুস সালাম

জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে
ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনের সাত নম্বর প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে পূর্ব প্রান্তে রয়েছে ঢাকা রেলওয়ের লোকোশেড। দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই সেখানে আসা-যাওয়া করে ট্রেনের অসংখ্য ইঞ্জিন। লোহালক্কড় নড়াচড়া আর ইঞ্জিনে হুইসিলের শব্দে মাথায় যেন সব সময় ধাক্কা দেয়। ১১ সেপ্টেম্বর বিকেলে এই লোকোশেড এলাকায় গিয়ে এমন দৃশ্যই দেখা যায়। লোকোশেডের ভেতরে যেতে চোখে পড়ল ১৩টি ইঞ্জিন। ১৯৫৩ সালের ইঞ্জিন থেকে শুরু করে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা নতুন ইঞ্জিনগুলোরও রক্ষণাবেক্ষণ তখন চলছিল। শ্রমিক-কর্মচারী সবাই ব্যস্ত। হাতে, নাকে, মুখে পোড়া মোবিলের দাগ। তাঁদের শরীর থেকে ছড়াচ্ছিল ঘাম আর ডিজেলের গন্ধ। কথা বলার সময় একদমই তাঁদের নেই। কারণ, সন্ধ্যাবেলার জন্য ইঞ্জিনগুলোকে প্রস্তুত করে দিতে হবে। একটু দেরি হলেই শিডিউল ঠিক রাখা যাবে না। কিছু সময় অপেক্ষার পর কয়েকজনের কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা জানান, ঢাকা রেলওয়ে লোকোশেডের অধীনে ৫১টি ইঞ্জিন রয়েছে। প্রতিদিন এসব ইঞ্জিনকে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। কারণ ইঞ্জিনসংকট। এ জন্য কোনো ইঞ্জিনকে বসিয়ে রাখা সম্ভব নয়। লোকোশেডের এক প্রকৌশলী বলেন, প্রতিদিন চার-পাঁচটি ইঞ্জিন ত্রুটি নিয়ে আসছে। এতটাই সংকট যে কোনো ইঞ্জিনকেই বসিয়ে রাখা যায় না। এগুলোর বিশ্রাম নেই। বিশ্রাম পেলে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা ভালো থাকে। কিন্তু সেই উপায় নেই।

লোকোশেডের আরেক প্রকৌশলী নিয়ে গেলেন জিএম বি১২ মডেলের একটি ইঞ্জিনের কাছে। পুরোনো প্রায় মরচে ধরা ইঞ্জিনটি দেখিয়ে তিনি বলেন, জেনারেল মোটরসের এই ধরনের ইঞ্জিন বিশ্বের বহু দেশে এখন জাদুঘরে রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই ইঞ্জিন মালামাল পরিবহনের কাজ দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে যাত্রী বহনও করতে হয়। একসময় বি১২ মডেলের ইঞ্জিনের গতি ছিল ৬৫ থেকে ৭৫ কিলোমিটার। এখন এর গতি ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটারের বেশি ওঠানো যায় না। এসব ইঞ্জিনের জ্বালানি খরচও বেশি।

ঢাকা লোকোশেডের আরেক প্রকৌশলী বলেন, বি১২ মডেলের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ এখন কোথাও পাওয়া যায় না। রেলওয়ে বহরে এ ধরনের ইঞ্জিন ৪০ থেকে কমে এখন ১১টি রয়েছে। নষ্ট ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ খুলে ১১টি ইঞ্জিন সচল রাখা হচ্ছে। সদ্য যোগ হওয়া ভারতীয় ইঞ্জিনগুলো নিয়েও বিপাকে পড়তে হচ্ছে বলে রেলওয়ের এই প্রকৌশলী জানান। তিনি বলেন, ভারতীয় রিকন্ডিশন্ড ইঞ্জিনগুলো পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টির শর্তে বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে আনা হয়। কিন্তু পাঁচ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর এখন এসব ইঞ্জিনেরও যন্ত্রাংশ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই এ দেশে ট্রেনের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা না হলে সমস্যা কাটবে না।

ঘাটতি ১০০ ইঞ্জিনের?
বাংলাদেশ রেলওয়েতে ইঞ্জিনসংকট কটি রয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তাঁরা কেউ সঠিক সংখ্যা জানাতে পারেননি। তবে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে রেলের ইঞ্জিনসংকটের কথা জানান রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। গত ১৭ মে রেল ভবনে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেমের সঙ্গে ১০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) কেনার চুক্তি সই হয়। চুক্তি সই অনুষ্ঠানে রেলমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে লোকোমোটিভ সংকটে ভুগছে। বহরের বেশির ভাগ ইঞ্জিনই মেয়াদোত্তীর্ণ। কাজেই এ চুক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে যত দ্রুত সম্ভব ইঞ্জিনের একটি চালান সরবরাহের অনুরোধ জানান মন্ত্রী।

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বাংলাদেশ রেলওয়ের কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা সূত্রে জানা গেছে, ভারতে প্রতি ৫০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পরপর একটি করে লোকোশেড রয়েছে। প্রতিটি লোকোশেডে ১০টি করে ইঞ্জিন রাখা হয়। বিকল হলে এসব ইঞ্জিন দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশ পার্বতীপুর, পাহাড়তলী, ঢাকা, কেলকাতে চারটি লোকশেড রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, বহরের ১০ শতাংশ ইঞ্জিন জরুরি প্রয়োজনে প্রস্তুত করে রাখতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়েতে সেটি নেই।

কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ২৭ থেকে ৩০টি ইঞ্জিন সব সময় সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখতে হয়। কিন্তু দেশে চাহিদার তুলনায় ইঞ্জিনসংকট রয়েছে ১০০টি। এর মধ্যে ৬০টি মিটারগেজ ও ৪০টি ব্রডগেজ ইঞ্জিনের সংকট রয়েছে।

লোকোমোটিভ কারখানা সূত্রে জানা গেছে, একটি নতুন ইঞ্জিনকে তিনটি ধাপে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, যাকে বলে থ্রি টায়ার্স মেইনটেন্যান্স। প্রথম ধাপে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় ইঞ্জিনের পরিবহন কাজ শুরুর দেড় বছর পর। দ্বিতীয় ধাপের কাজ করা হয় তিন বছর পর এবং তৃতীয় ধাপের রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় সাড়ে চার বছর পর। একটি নতুন ইঞ্জিনের বয়স ছয় বছর পেরিয়ে গেলে সেটিকে পার্বতীপুরে কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানায় পাঠানো হয়। সেখানে ইঞ্জিনটির সব যন্ত্রাংশ খুলে মান যাচাই করা হয়। এ ছাড়া একটি ইঞ্জিনের বয়স ১৬ বছর হয়ে গেলে এর সব যন্ত্রাংশ বদলে ফেলা হয়।

 

একটি ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা থাকে ২০ বছর। ছবি: আবদুস সালাম

 

রেললাইন স্থাপনে প্রকল্প বেশি
রেল সূত্রে জানা গেছে, রেলের উন্নয়নে এখন ৪৮টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে ৪৩টি প্রকল্প রেললাইন স্থাপন, সংস্কার, নতুন লাইন স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইসংক্রান্ত। বাকি পাঁচ প্রকল্পে ইঞ্জিন কেনাসহ অন্যান্য উন্নয়নকাজ অন্তর্ভুক্ত।

২০১১-১৫ রেলওয়ের ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ৪৩ হাজার ৫৯৯ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় মূলত ঢাকা-মাওয়া-জাজিরা-ভাঙা রুটে ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণ, এর সঙ্গে দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার রুটে মিটারগেজ রেললাইন এবং ফৌজদারহাট-চট্টগ্রাম বন্দরে ডবল লাইনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে জন্য। এ ছাড়া ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেললাইন পুনর্বাসন প্রকল্প, পার্বতীপুর-কাঞ্চন-পঞ্চগড় এবং কাঞ্চন-বরাই রুটে রেললাইন নির্মাণ এবং বিরল স্টেশন থেকে বিরল সীমান্ত পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণকাজে এই অর্থ বরাদ্দ করা হয়। সেখানে ইঞ্জিন কেনার পরিকল্পনা প্রাথমিকভাবে ছিল না। পরে ওই পরিকল্পনায় ইঞ্জিন কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়। ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা দিয়ে ৫৬টি ইঞ্জিন কেনা হয়।

২০১৬-২০ সাল পর্যন্ত সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ৬৬ হাজার ৩৩৭ কোটি ৭১ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ১৪০টি নতুন ইঞ্জিন কেনা হবে। সূত্রমতে, একেকটি ইঞ্জিনের দাম ২৫ থেকে ৩০ কোটির টাকার মধ্য হবে। এর মধ্যে কেবল দক্ষিণ কোরিয়ার ১০টি নতুন মিটারগেজ ইঞ্জিন রেলবহরে যুক্ত হবে দুই বছর পর ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে। বাকি ১১০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ৪০টি ব্রডগেজ ইঞ্জিন কেনার দরপত্র খোলা হয়েছে। এর কারিগরি দিক মূল্যায়নের কাজ চলছে। রেল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইঞ্জিনগুলো কেনার সম্ভাবনা বেশি।

বাকি ৭০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কেনা হবে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই কোম্পানি থেকে। বিনিয়োগকারীর সঙ্গে এ বছরের মধ্যেই চুক্তির চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বছর চুক্তি হলে ২০২০ সালের শেষ দিকে ৭০ ইঞ্জিন আসবে।

520a8f868b09a929917c11b57f4e4903-5b545018b1bea.jpg

শনিবারগুলো বরাবরই আমার কাছে একটু বিশেষ। ১৪ জুলাই বিকেলে ‘১৭০’ বাসে চেপে বসলাম, গন্তব্য বুকিত পানজাং হয়ে সিঙ্গাপুর এক্সপো। সন্ধ্যা ছয়টায় বসবে ইন্টার রেসিয়াল ইন্টার রিলিজিয়াস হারমনি (আইআরআইআরএইচ) নাইটের ১৫তম আসর। সরাসরি রাষ্ট্রপতি আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, বিশাল ব্যাপার!

আমি সিঙ্গাপুরে একটা প্রকৌশল কোম্পানিতে ‘টেকনিশিয়ান’ হিসেবে কাজ করছি। এর পাশাপাশি দুটি সংগঠনে স্বেচ্ছাসেবক ও বাংলা অনুবাদক হিসেবে কাজ করছি। সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এসডিআই) একাডেমিতে কাজ করছি দীর্ঘদিন ধরে। এসডিআই একাডেমি মূলত সিঙ্গাপুরে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিদের ইংরেজি শেখানোসহ বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে।

প্রতি সপ্তাহের শনি, রোববার চলে ইংরেজি শেখানোর ক্লাস। ৫ হাজারের বেশি বাঙালি শ্রমিকদের আমরা এসডিআই একাডেমি থেকে ইংরেজি শিখিয়েছি। আইআরআইআরএইচ নাইটে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয় প্রতিবছর। এসডিআই থেকে আমরা ১৫ সদস্যের প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিলাম এবারের আসরে।

প্রায় এক ঘণ্টা দশ মিনিটের পথ, এ মাথা থেকে ও মাথা বলা চলে। ট্রেনে বসে গত আসরের ছবিগুলো দেখছিলাম। এত বড় মানের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ কখনো হয়নি। খুব সাধারণ, ছোট একজন বিদেশি শ্রমিকের কাছে এটা সত্যিই বড় ব্যাপার। এক্সপো এমআরটি স্টেশনে এক্সিট নিয়ে ওপরে উঠতেই এক স্বেচ্ছাসেবী ‘হাই’ বলে এগিয়ে এলেন। অনুষ্ঠানে এসেছি কি না, জিজ্ঞেস করলেন। মাথা নাড়তেই উত্তর এল, ‘গো স্ট্রেট অ্যান্ড টার্ন রাইট’ (সোজা গিয়ে ডানে যাও)।

হল ৭–এর সামনে পিঁপড়ার মতো মানুষ এসে জড়ো হচ্ছিল। স্বেচ্ছাসেবকেরা এতই বন্ধুসুলভ যে প্রায় পদে পদেই ‘হাই-হ্যালো’র জবাব দিতে হচ্ছিল। এসডিআই একাডেমির ১৫ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তৌফিক ভাই। রাইসা আপু, মামুন ভাই, নজরুল ভাই, জাব্বির ভাই, রুবেল ভাই, সাব্বিরসহ একে একে সবাই হাজির। আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলেন বন্ধু সংগঠন ‘আইওয়াইসি’ ও চ্যানেল নিউজ এশিয়ার দুজন তরুণ প্রতিবেদক। হলের চোখ ধাঁধানো লাইটিং মুগ্ধ করার মতো। হাজারো স্পট, টার্গেট লাইট চোখে এসে পড়ছিল। কত্ত বড় আয়োজন! সুন্দর করে সাজানো চেয়ার, টেবিল।

বাঁশি, সানাই, গিটার, পিয়ানো, হারমোনিয়াম…আরও নানা বাদ্যযন্ত্রে বাজছিল অদ্ভুত সুরে। নিজ নিজ চেয়ার-টেবিল খুঁজে নিয়ে আমরা অনুষ্ঠান উপভোগ করতে শুরু করলাম। উপস্থাপক–উপস্থাপিকা মঞ্চে এলেন, ইংরেজিতেই চলছে সব। ঘোষণা করা হলো, মূল অতিথি রাষ্ট্রপতি হালিমা ইয়াকুব কিছুক্ষণের মধ্যেই উপস্থিত হবেন।ভিনদেশি ও বাংলাদেশি তরুণ দলের সঙ্গে লেখক (ডানে)

ভিনদেশি ও বাংলাদেশি তরুণ দলের সঙ্গে লেখক (ডানে)

হলের বাইরে ম্যাডাম হালিমা তখন ১৫টি ছবিতে স্বাক্ষর করছেন। অনেকেই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে হাত মেলাতে আগ্রহী। আমরাও তাঁদের সঙ্গে লালগালিচার পাশে জায়গা করে নিলাম। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে একে একে অন্য অতিথিরাও মিলনায়তনে পা রাখলেন। ৬টি বড় পর্দায় তখন অনুষ্ঠানটি সরাসরি দেখা যাচ্ছিল।

রাষ্ট্রপতি এগিয়ে এলে আমি সালাম দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলাম। বললেন, ‘ইউ আর ফ্রম…?’ (তুমি কোথা থেকে?’ বললাম, ‘আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ।’ ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন। অতিথিরা আসন গ্রহণ করার পর আমি ক্যামেরায় কিছু ভালো মুহূর্ত ধরে রাখার দিকে মনোযোগী হলাম।

সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সমঝোতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর এই আয়োজন করে থ্যি হুয়া কুয়ান ম্যুরাল সোসাইটিসহ সাতটি প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন দেশ, ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের লোকজন উপস্থিত হন এখানে। দুই উপস্থাপকের ঘোষণার পর কয়েকটি ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে কিছুটা অংশ পাঠ করা হলো। সবাই চুপ করে শুনলেন।

এরপর শুরু হলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ইউরোশিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের দলনেতা তাঁদের দেশীয় গান গেয়ে শোনালেন, পেছনে নাচ চলছিল একই সঙ্গে। এরপর থাইল্যান্ডের সংস্কৃতি তুলে ধরতে মঞ্চে এলেন থাইল্যান্ডের সাংস্কৃতিক দল। নাচলেন সিঙ্গাপুর ইন্ডিয়ান ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের বন্ধুরা। ইয়াইয়াসান মেনডাকি দলের সদস্যরা উচ্চাঙ্গসংগীত শোনাতে মঞ্চে উঠলেন। আলো ঝলমলে পরিবেশে অনুষ্ঠানের পাশাপাশি টুং টাং শব্দে চলছিল খাওয়াদাওয়াও। কত রকমের খাবার! একটা যায় তো আরেকটা আসে। কোমল পানীয়ের গ্লাস কখনো ফাঁকা হচ্ছিল না। বাহারি সব খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে টেবিলে, আমরা রীতিমতো বিপদে পড়েছি। চপস্টিক চালিয়ে খাওয়ার অভ্যাস নেই আমাদের কারোরই। অথচ অন্যরা দিব্যি খেয়ে নিচ্ছেন। আমরা একে অন্যের চপস্টিক ধরা দেখে হাসাহাসি করলাম কিছুক্ষণ।

একসময় রাষ্ট্রপতি মহোদয়কে শুভেচ্ছা বক্তব্যের জন্য মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানো হলো। দীর্ঘদিন ধরে ৪০টির বেশি সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ম্যাডাম হালিমা। তিনি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাজ খুব উৎসাহিত করেন। আমরা যাঁরা আমন্ত্রিত হয়েছিলাম, সবার কাজ সম্পর্কেই তিনি আগে খোঁজ নিয়েছেন। আমাদের কাজ তাঁর পছন্দ হয়েছে বলেই হয়তো, আমরা জায়গা পেয়েছিলাম একেবারে সামনে।

উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে হালিমা ইয়াকুব বললেন, ‘ধর্মীয় ও জাতিগত বৈচিত্র্য আমরা উদ্‌যাপন করি। যদিও বিশ্বের অনেক দেশে এটা সংঘাত ও দ্বন্দ্বের কারণ।’ মানবতার উন্নতিতে অবদান রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বক্তব্য শেষ করেন। জানি না কেন, তাঁকে দেখে খুব সাধারণ, সাদাসিধে মানুষ বলে মনে হলো।

অনুষ্ঠান শেষে সব পারফরমার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে মঞ্চে উঠলেন। গাইলেন ‘স্ট্যান্ড ফর সিঙ্গাপুর’। আমরা যতটা পারি ছবি তুলে নিলাম। কে জানে, এমন সুযোগ কি আর কখনো হবে! নানা দেশের তরুণদের সঙ্গে দেখা হয়েছে এই অনুষ্ঠানে। কেন জানি না, হাত বাড়িয়ে ‘আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ’ বলতে খুব ভালো লাগছিল।

8a85cb9635918ef996d57d1fe31e77fd-5b4af132d0454.jpg

অন্য অনেক দেশের পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা উড়তে দেখার যে কী আনন্দ, সেটা ফাহিম, নাহিয়ান, জাবেররা আগে জানতেন না। তাঁরা সবাই আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কয়েক দিন আগে গাড়ি তৈরির একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের এ দলটি ঘুরে এসেছে ফ্রান্স থেকে।

প্রতিযোগিতার নাম শেল ইকো ম্যারাথন। সারা বিশ্বের একটি অন্যতম মর্যাদাসম্পন্ন অটোমোবাইল প্রতিযোগিতা এটি। প্রকৌশল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা নিজেদের বানানো গাড়ি নিয়ে এই আয়োজনে অংশ নেন। শর্ত হলো—গাড়িটি হতে হবে জ্বালানিসাশ্রয়ী, নিরাপদ এবং আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন।

বাংলাদেশ থেকে একমাত্র দল হিসেবে ‘টিম রেড-এক্স’ এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। দলের মোট সদস্য ১৫ জন। সবাই আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। অধ্যাপক ড. দেওয়ান হাসান আহমেদ এবং সহকারী অধ্যাপক মো. জুবায়ের হোসেনের তত্ত্বাবধানে টিম রেড-এক্স-এর নেতৃত্ব দেন নাহিয়ান অর্নব। দলের অন্য সদস্যরা হলেন জাবের, ফাহিম, আফনান, রাব্বী, এহসান, সাদমান, ফারাবী, রিজবান, শুভ, তন্ময়, স্বরণ, অয়ন ও তাসিন।

গাড়ি বানানোর এই প্রতিযোগিতায় তাঁরা অংশ নিয়েছিলেন গত বছরও। সেবার আসর বসেছিল সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি এক্সিবিশন সেন্টারে। সেখানে ছোট ছোট ডকে সব দেশের প্রতিযোগীদের গাড়ি রাখা হয়। একদিন ফাহিমরা সেখানে গিয়ে অবাক—কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যাগভর্তি খাবার আর ফুল নিয়ে হাজির হয়েছিলেন এই তরুণদের জন্য। দলের সদস্য নাহিয়ান অর্নব বলছিলেন, ‘আমরা তো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। কারণ, এখানে কোনো বাঙালি আমাদের পরিচিত নন। কাউকে আমরা কিছু জানাইনি। তাঁরা নিজেরাই খোঁজ নিয়ে চলে এসেছেন। বিদেশে এটা আমাদের প্রথম ভালোবাসা কিংবা অনুপ্রেরণা বলতে পারেন।’

ছোটখাটো কিছু ত্রুটির কারণে সেবার কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেলেও ২৩টি দেশের ১২৩টি দলের মধ্যে তারা ‘আরবান কনসেপ্ট গ্যাসোলিন’ শ্রেণিতে নবম ও ‘সমগ্র আরবান কনসেপ্ট’ শ্রেণিতে ১৯তম স্থান অর্জন করেছিলেন। উল্লেখ্য, শেল ইকো ম্যারাথনে দুই ধরনের গাড়ি অংশগ্রহণ করে। প্রোটোটাইপ (সাধারণত ৩ চাকাবিশিষ্ট) ও আরবান কনসেপ্ট (৪ চাকাবিশিষ্ট)। এ দুই শ্রেণির মধ্যে আরও কিছু বিভাগ থাকে। যেমন: গ্যাসোলিন, ডিজেল আর ইথানল মিলে হয় আইসি, ইলেকট্রিক ইত্যাদি।

গত ২৯ মে থেকে ১ জুন ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হলো এবারের প্রতিযোগিতা। অংশ নেয় ২১টি দেশের ৫০টি দল। টিম রেড-এক্স আরবান কনসেপ্ট গ্যাসোলিন ফুয়েল শ্রেণিতে দ্বিতীয় ও সমগ্র আরবান কনসেপ্ট গাড়িগুলোর মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করে।

২০১৫ সালে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দল টিম অভিযাত্রিক। সে সময় টিম রেড-এক্স-এর সদস্যরা সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছেন। চোখেমুখে রঙিন স্বপ্নের আনাগোনা। বড় ভাইদের কাছ থেকে এই প্রতিযোগিতার কথা শুনেই তাঁরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন।

একটা গাড়ি তৈরি করা তো চাট্টিখানি কথা নয়। প্রকৌশল জ্ঞানের পাশাপাশি টাকাও এখানে বড় প্রয়োজন। একদল কাজ করছিল স্পনসর সংগ্রহের জন্য। অন্যদিকে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে খরচ করে ধোলাইখালে চলছিল গাড়ি তৈরির কর্মযজ্ঞ। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা যোগ হয়েছে এই শিক্ষার্থীদের ঝুলিতে। দলের একজন রিজবান আহমেদ বলছিলেন, ‘স্পনসর জোগাড় করাটা খুব কঠিন ছিল। কেউই বিশ্বাস করতে চাচ্ছিল না আমরা এ রকম কোনো গাড়ি তৈরি করতে পারব। এক কোম্পানি বলে দিল, “ইটস টোটালি রাবিশ!” ধোলাইখালেও শুনেছি, “এরা করে কী? ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে ঠেলাগাড়ি বানানো শুরু করছে! ”’

সব বাধা-বিপত্তি পার করেই তাঁরা পৌঁছেছিলেন ফ্রান্সে, বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে। জাবের মাওলা বলছিলেন, ‘অন্য দেশের পতাকাগুলোর সঙ্গে যখন আমাদের পতাকা উড়তে দেখলাম, মনে হলো লাল-সবুজ পতাকাটা আগে কখনো এত সুন্দর লাগেনি। অজান্তেই চোখে পানি এসে গেছে।’

2060d44877730b33ead58387af845f86-5b6691a228a86.jpg

ভিনদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ হয়েছে দুবার। প্রথমবার, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) মুখপাত্র হিসেবে গিয়েছিলাম ভারতে। আর এ বছর বেসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের হয়ে তরুণ প্রতিনিধি হিসেবে ঘুরে এলাম নেপাল। বাংলাদেশে থেকে প্রতিবছর অনেক ছেলেমেয়ে বিভিন্ন সম্মেলন, প্রতিযোগিতা কিংবা ‘এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’–এ অংশ নিতে ভিনদেশে যায়। এসব আয়োজন কিন্তু বিদেশি তরুণদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার, তাঁদের ভাবনার জগতের সঙ্গে আমাদের ভাবনার মিল-অমিল খুঁজে বের করার এবং তাঁদের কাছ থেকে নতুন কিছু শেখার একটা দারুণ সুযোগও।

ভারতে যেহেতু বিএনসিসির প্রতিনিধি হিসেবে গিয়েছি, সেখানে নানা দেশের ক্যাডেটদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। দেখা হয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। নেপালে ইউনিসেফ দক্ষিণ এশিয়া আয়োজিত ৩ দিনের সেমিনারেও রাশিয়া, আমেরিকা, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভিয়েতনাম, পানামা, সাউথ সুদানসহ বিভিন্ন দেশের বন্ধু পেয়েছি।

ভারত ঘুরে মনে হয়েছে, সেখানকার বন্ধুরা অনেকটা আমাদের বাঙালিদের মতো। আমাদের মতোই বেশি কথা বলে! তবে আপ্যায়নের দিক থেকে বোধ হয় আমাদের চেয়ে একটু পিছিয়ে আছে। পাকিস্তানি একজন বন্ধু হয়েছে নেপালে গিয়ে। ওর নাম কারিশমা আলী। দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি মেধাবী। পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে খেলে সে। তবে এত সহজে এই সুযোগ পায়নি। মৃত্যুর হুমকি পেয়েছে বহুবার। নারী উন্নয়নে পাকিস্তান অনেকটাই পিছিয়ে। কারিশমা আমাকে বলেছে, ওদের দেশে নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, নারী ও শিশু পাচারের হার অনেক বেশি হয়। তবু লুকিয়ে লুকিয়ে সে বিভিন্ন বাসায় গিয়ে গৃহিণীদের ইংরেজি পড়ায়। লুকিয়ে ফুটবল খেলতে যায়। এই বন্ধুর সাহস আমাকে মুগ্ধ করেছে। নেপাল আবার সামাজিকভাবে নারীদের জন্য বেশ নিরাপদ।

রাশিয়ার বন্ধুদের সঙ্গে সেলফিরাশিয়ার বন্ধুদের সঙ্গে সেলফিসিঙ্গাপুর থেকে ভারতে এসেছিল ১২ জন ক্যাডেট, তাদের মধ্যে মাত্র একজন মেয়ে। নাম রিটো। আমার রুমেই ছিল সে। ওরা বোধ হয় ‘কথা কম কাজ বেশি’ নীতিতে বিশ্বাসী। এত কম কথা বলে একটা মানুষ কীভাবে বাঁচতে পারে, আমি ভেবে পাই না! ওদের নিয়ম হলো বাসে, খাওয়ার টেবিল ও ক্লাসরুমে কথা না বলা। কিন্তু আমার রুমে যেহেতু ছিল, তা–ও আবার আমার দোতলা বিছানার ওপরে, কথা না বলে যাবে কই! আমার একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, এই ভয়েই মনে হয় বেচারা রুমে কম থাকত! ওকে আমার শাড়ি পরিয়ে দিয়েছিলাম। শাড়ি পরে সে কী যে খুশি! ছবি তুলতে তুলতে সেদিনই প্রায় তার ফোনের মেমোরি শেষ করে ফেলছিল। যাওয়ার আগে আমি ওকে উপহার দিয়েছি। সে-ও আমাকে উপহার দিতে ভোলেনি।

ভিয়েতনামের বন্ধুটি বেশ হাসিখুশি

ভিয়েতনামের বন্ধুটি বেশ হাসিখুশিতবে উপহার দেওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রাখতে হবে ভিয়েতনামের বন্ধুদের। ভীষণ বন্ধুপরায়ণ ওরা। নিজেদের রুম রেখে বেশির ভাগ সময় আমাদের রুমেই থাকত। উপহারের প্রতিযোগিতায় ওদেরকে কিছুতেই হারাতে পারিনি। মজা করে কথা বলে। ওদের দেশে অবশ্য ক্যাডেট কোর নেই। ওরা এসেছিল ইয়ুথ ফোরাম থেকে।

রাশিয়ার বন্ধুদের খুব অদ্ভুত মনে হয়েছিল। কথা বলে না, হাসে না। এদিকে আমি তো ওদের সঙ্গে কথা বলেই ছাড়ব! পরিচিত হওয়ার পর বুঝলাম, সমস্যাটা কোথায়। ওদের দলের ২৫ জন সদস্যের মধ্যে ইংরেজি পারে মাত্র একজন।

আমার ভিনদেশি বন্ধুদের মধ্যে অনেকের সঙ্গে ফেসবুকে যোগাযোগ হয় নিয়মিত। যদিও তাঁদের কেউই বাংলা পড়তে পারে না, তবু এই লেখার সুযোগে তাদের জানাই বন্ধু দিবসের শুভেচ্ছা।

40377b70894edfe8062d538b0df5e8a2-5b5d611a70e30.gif

নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির (এনওয়াইইউ) যে বিষয়টি আমার সবচেয়ে পছন্দ তা হলো, এখানকার ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ভিনদেশ থেকে এসেছে। পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে কলেজের গণ্ডিতে পা রেখেছে, এমন শিক্ষার্থীর হারও নিশ্চয় একই রকম। একটা দলে যতটা বৈচিত্র্য থাকা সম্ভব, তার সবই এখানে আছে।

১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে আমি যখন স্নাতক হলাম, তখন চমৎকার একদল বন্ধুর সঙ্গে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছিলাম। বিস্ময়করভাবে সেই বন্ধুরা এখনো আমার খুব আপনজন। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকার নানা প্রান্তে আমরা বেড়িয়েছি, পাহাড় চড়েছি। এটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। সে এক দারুণ রোমাঞ্চ! আমার জ্ঞানে, শিক্ষায় এই ভ্রমণের একটা গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। কারণ এই প্রথম আমাকে নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়েছে, নতুন নতুন অভিজ্ঞতা, রীতিনীতি, ভাষা, মূল্যবোধের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে। কানাডার মন্ট্রিয়েলের এক তরুণের যখন মৌরিতানিয়ায় বসবাসরত একজন কোরীয় জেলের সঙ্গে দেখা হয়, আফগানিস্তানে যুদ্ধ করে আসা এক রাশিয়ান সৈনিক কিংবা ডানাংয়ের এক দোকানদারের সঙ্গে পরিচয় হয়, অবধারিতভাবেই আড্ডাটা জমে ওঠে। অনেক অজানাকে জানা হয়।

তোমাদের মধ্যে অনেকেও নিশ্চয়ই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষে একটা ভ্রমণে বেরোনোর পরিকল্পনা করছ। জানি কেউ কেউ তোমাদের বলবে, ‘আজকালকার দিনে, এই বয়সে এমন একটা ভ্রমণে বেরোনো ঠিক হবে না। এটা নিরাপদ নয়!’ আমার প্রশ্ন হলো, আমাদের এই শুভাকাঙ্ক্ষীরা কি শুধু আমাদের শারীরিক নিরাপত্তা নিয়েই দুশ্চিন্তিত? নাকি তাঁরা ভাবেন, নিজের গণ্ডি থেকে বেরোলে আমরা হয়তো একটা নতুন পৃথিবী দেখব, নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে মিশে হয়তো আমার বিশ্বাস আর মূল্যবোধগুলো বদলে যাবে, আমি হয়তো একটা অন্য মানুষ হয়ে ফিরে আসব! হয়তো এই ভয়েই তাঁরা আমাদের আগলে রাখতে চান।

১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমি যখন বেরিয়েছিলাম, তখনকার পৃথিবীও কিন্তু কম জটিলতাপূর্ণ ছিল না। সমস্যা ছিল, আছে, ভবিষ্যতেও আসবে। যদি আমরা নিজস্ব গণ্ডির ভেতরে বন্দী হয়ে থাকি, তাহলে কখনোই পরস্পরকে সম্মান করতে শিখব না, সবাই মিলে একটা সমস্যার সমাধান করতে পারব না। নেতিবাচকতার প্রতি আমাদের একটা অদ্ভুত মোহ আছে। সিনেমা, টিভি, সব জায়গায় তুমি এই ব্যাপারটা দেখবে। অথচ সমস্যা আর সম্ভাবনা কিন্তু সব সময় ভারসাম্য রেখে চলে। চরম দারিদ্র্য আমরা পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারি, ম্যালেরিয়া বা টিবির নাম মুছে ফেলতে পারি, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে পারি। এটা করতে হলে আমাদের সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে হবে। আমাদের সংকীর্ণ মানসিকতার সঙ্গে লড়াই করতে হবে মানবতা দিয়ে।

আমরা একই গির্জায় যাই? দারুণ, তুমি আমার গোষ্ঠীর। তুমি আমার ভাষায় কথা বলো? তাহলে তুমি আমার দলে। তুমি এনওয়াইইউতে পড়েছ? তুমি আমাদের একজন। তুমি পোকেমন গো খেলো? তাহলে তুমি আমার দলে। সব জায়গায় শুধু দল, জাতি, গোষ্ঠী। কাউকে দলভুক্ত করা সমস্যা নয়, সমস্যা হলো বাকিদের দলের বাইরে বের করে দেওয়া। তুমি আমাদের একজন, কিন্তু ও নয়!

বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, ধর্ম, বিশ্বাস কিংবা মূল্যবোধের বৈচিত্র্য আমাদের দুর্বলতা হতে পারে না। বরং এটাই তো সবচেয়ে বড় শক্তি।

অতএব তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ, এখান থেকে বেরিয়ে তোমরা এমন একটা জায়গায় যাও, যেখানকার মানুষের বিশ্বাস বা মূল্যবোধ তোমার চেয়ে আলাদা। তাঁদের কথা মন দিয়ে শোনো, বুঝতে চেষ্টা করো। খুঁজে বের করো, তোমার সঙ্গে তাঁর মিলটা কোথায়। আঙুলের ছোঁয়ায় তুমি সারা পৃথিবী দেখতে পারো। কিন্তু তুমি যদি পৃথিবীর অন্য একটা প্রান্তে যাও, দেখবে একটা পুরো অন্য জগৎ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। প্রতি পদে পদে তোমার কোনো না কোনো ‘শিক্ষকের’ সঙ্গে দেখা হবে আর তুমি নতুন কিছু শিখবে। এই শিক্ষাকে সাদরে গ্রহণ করো। তুমি একজন ছাত্র। আজীবন ছাত্রই থাকবে। কিন্তু এখন তোমার নেতৃত্ব দেওয়ার সময়।

প্রতিটি প্রজন্মেই একজন নেতার জন্ম হয় কখন জানো? যখন একজন বুঝতে পারে, সমস্যা সমাধানের দায়িত্বটা অন্য কারও নয়, নিজের। এখন এই উপলব্ধির সময় তোমাদের।
অভিনন্দন ২০১৮-এর ক্লাস। যাও, পৃথিবী বদলে দাও! (সংক্ষেপিত)

dt45.jpg

পাঠ্যবইয়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়ে যতটা আনন্দ পাওয়া যায়, হাতে-কলমে ব্যবহারিক কাজের মাধ্যমে বিষয়টা শেখার আনন্দ তার চেয়ে বেশি। তবে আন্তর্জাতিক ফিজিকস অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের আনন্দ এই সব আনন্দকে ছাপিয়ে যায়। এ বছর ৪৯তম আন্তর্জাতিক ফিজিকস অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হলো পর্তুগালে। বাংলাদেশ থেকে সেখানে অংশ নিয়েছিলাম আমরা পাঁচজন। নটর ডেম কলেজ থেকে আমি ও তাহমিদ মোসাদ্দেক, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের রাশেদুল ইসলাম, চট্টগ্রাম কলেজের আবরার আল শাদিদ ও বরিশাল জিলা স্কুলের ইমতিয়াজ তানভীর রহিম। আমাদের দলের সঙ্গে কোচ হিসেবে ছিলেন অধ্যাপক এম আরশাদ মোমেন এবং বাংলাদেশ ফিজিকস অলিম্পিয়াড কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর মাসুদ।

পর্তুগালে নেমেই দেখা হয় আমাদের গাইড সাহেদ ইব্রাহিমের সঙ্গে। বিদেশি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের মানুষকে গাইড হিসেবে পেয়ে খুব ভালো লেগেছে। সারাক্ষণই তো বাংলাদেশের গল্প করলাম আমরা। একদিকে ভ্রমণক্লান্তি তখনো কাটেনি। তার ওপর পরীক্ষা নিয়েও খানিকটা দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তা ভুলে অংশ নিই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। ৮৭টি দেশের ৪৪৭ জন শিক্ষার্থী এবারের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। আমরা স্পেন, রোমানিয়াসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গল্প জমানোর সুযোগ পাই। যতজনের সঙ্গে কথা হলো, সবাই কম-বেশি বাংলাদেশকে চেনে। কেউ কেউ আমাদের লাল-সবুজ পতাকা দেখে কৌতূহলী হয়ে নানা প্রশ্ন করে। আমরাও খুব আগ্রহ নিয়ে উত্তর দিই।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরদিন শুরু হয় মূল প্রতিযোগিতা। পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে ৪০ নম্বর শুধু ল্যাব পরীক্ষা ছিল। তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক-পরীক্ষা দুটি অংশে বিভক্ত। ৫ ঘণ্টা করে দুই দিনে ১০ ঘণ্টা পরীক্ষা দিতে হয়। ব্যবহারিক পরীক্ষার সুযোগ আমাদের কম বলে এই অংশ নিয়ে একটু ভয় ছিল। অজানা ভয়কে কাটানোর জন্য আমরা পুরো সময়ই নিজের মধ্যে পদার্থবিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে গল্প-আড্ডায় মেতে ছিলাম। দিনে পরীক্ষা আর বিকেলে ঘোরাঘুরির সুযোগ পেয়েছিলাম আমরা। পর্তুগালের বিভিন্ন জাদুঘর আর দুর্গে ঘোরার সুযোগ হয়েছে। আমাদের জন্য বিভিন্ন সম্মেলনও আয়োজন করা হয়েছিল। নাসার নভোচারী থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী ও পদার্থবিদদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাই আমরা।

গত ২৮ জুলাই সমাপনী দিনে জানা যায় ফলাফল, এবারের আন্তর্জাতিক ফিজিকস অলিম্পিয়াডে চারটি ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করি আমরা—আমি, আবরার, তাহমিদ ও রাশেদুল। আমাদের দলের দুজন সদস্য তিন পয়েন্টের জন্য সিলভার পদক এবং অন্য একজন দুই পয়েন্টের জন্য

অনারেবল মেনশন মিস করেছে। একটা সমস্যায় ‘পারফেক্ট স্কোর’ করেছি আমি। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ফিজিকস অলিম্পিয়াড একটু কঠিন, তারপরও আমাদের দলীয় সাফল্যে আমরা খুশি।
এ বছর বাংলাদেশ যত অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছে, সবখানেই চমক সৃষ্টি করেছে। সেই দলে আমরাও আছি বলে ভীষণ আনন্দিত। বাংলাদেশের জন্য বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করতে পারা যতটা গর্বের, ততটাই আনন্দের। ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশ ফিজিকস অলিম্পিয়াড কমিটি বাংলাদেশে ফিজিকস অলিম্পিয়াডের আয়োজন করে আসছে। গত বছর থেকে এই আয়োজনের সঙ্গে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও ব্যবস্থাপনায় প্রথম আলো যুক্ত হয়েছে। আমরা ভবিষ্যতে নিজেদের ছাপিয়ে যাব, এই প্রত্যয় নিয়েই পর্তুগাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে বিমানে চড়েছিলাম। আশা আছে, আগামীবার ফলাফল আরও ভালো হবে।

High-Court-2-1280x718.jpg

কিছু পরিমার্জনসহ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ ও সহায়তাকারীর সুরক্ষা প্রদান নীতিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার দুই মাসের মধ্যে ওই গেজেট করতে স্বাস্থ্যসচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি ফরিদ আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ বুধবার এই রায় দেন।

২০১৮ সালে করা ওই নীতিমালার দুটি অংশে পর্যবেক্ষণ দিয়ে উচ্চ আদালত তা নীতিমালায় সংযুক্ত করতেও বলেছেন।

আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী রাশনা ইমাম, আনিতা গাজী রহমান ও শারমিন আক্তার। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী জিনাত হক।

রায়ের পর আইনজীবী শারমিন আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, হাইকোর্ট এর আগে রুল দিয়েছিলেন। রুলে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসাসেবা দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। আদালত রুল যথাযথ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২০১৮ সালে করা ওই নীতিমালার দুটি অংশে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট, যা নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করে গেজেট আকারে প্রকাশ করতে বলা হয়েছে বলে জানান এই আইনজীবী।

২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি গুরুতর আহত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য দেশের সব হাসপাতালকে নির্দেশ দিয়ে রুল দেন হাইকোর্ট। মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও সৈয়দ সাইফুদ্দিন কামাল নামের এক ব্যক্তি জনস্বার্থে রিট আবেদনটি করেন। সে সময় ব্লাস্ট জানায়, জরুরি চিকিৎসাসেবা দিতে বিভিন্ন হাসপাতালের অস্বীকৃতি জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে ওই রিট আবেদনটি করা হয়েছে। রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত ওই আদেশ দেন। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সারা হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মোতাহার হোসেন সাজু।

আদেশে বলা হয়, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তাসংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনা ২০১৪-১৬ অনুসারে রাষ্ট্রের সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে জরুরি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে একটি প্রতিবেদন আগামী তিন মাসের মধ্যে আদালতে জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং চিকিৎসা পেতে বাধা পেলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কোথায় অভিযোগ করবেন, সে বিষয়ে নীতিমালা তৈরি ও এই বিষয়ে গণমাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টিতে নির্দেশ দেন আদালত। স্বাস্থ্য এবং পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। আদেশের পাশাপাশি আদালত রুল দেন। সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির জরুরি চিকিৎসাসেবা কেন দেওয়া হবে না, সেটাও বিবাদীদের কাছে আদালত জানতে চান।


About us

DHAKA TODAY is an Online News Portal. It brings you the latest news around the world 24 hours a day and 7 days in week. It focuses most on Dhaka (the capital of Bangladesh) but it reflects the views of the people of Bangladesh. DHAKA TODAY is committed to the people of Bangladesh; it also serves for millions of people around the world and meets their news thirst. DHAKA TODAY put its special focus to Bangladeshi Diaspora around the Globe.


CONTACT US

CALL US ANYTIME


Newsletter