ডা. লোটে শেরিং Archives - 24/7 Latest bangla news | Latest world news | Sports news photo video live

v3bs.jpg

চার দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে দেশে ফিরে গেছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং। সফরকালে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন এই ছাত্র বাংলাদেশকে নিজের দ্বিতীয় বাড়ি হিসেবে অভিহিত করেন। বেশ কয়েক বছর বাংলাদেশে কাটানোর স্মৃতি তাকে এখনো আপ্লুত করে বলে জানান।

ডা. লোটে  সোমবার সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে ড্রুক এয়ার ফ্লাইটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়ে যান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম এনামুর রহমান ও অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ তাকে বিমানবন্দরে বিদায় জানান।

ভুটানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গত বছর দায়িত্ব গ্রহণের পর এটাই তার প্রথম বাংলাদেশ সফর। সফরকালে বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে কয়েকটি চুক্তি সই হয় এবং দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেয়ার ব্যাপারে সম্মত হন দুই প্রধানমন্ত্রী।

ভুটানের প্রধানমন্ত্রী রাজধানীতে গতকাল নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে দেশবাসীকে অভিনন্দন জানান। সেখানে তিনি বাংলা-ইংরেজি মিশ্রিত বক্তব্যে সবার হৃদয় কেড়ে নেন।

পরে তিনি শিক্ষা জীবনের দশ বছর কাটানো ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে যান। সেখানে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেই বক্তব্যেও তিনি শ্রোতা-দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হন। নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতি, একজন চিকিৎসক হিসেবে করণীয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে তার দেয়া বক্তৃতায় অনলাইনে এখন ভাইরাল।

botan-big-20190414230511.jpg

১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত আমি ও আমার সহপাঠী, অর্থাৎ আমার মন্ত্রিপরিষদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ময়মনসিংহ শহরের বাঘমারা মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসের ২০ নম্বর কক্ষে থেকেছি। এখনো আমরা একসঙ্গে রাজনীতি করছি। দীর্ঘসময়ে আমাদের মাঝে কোনোদিন মনোমালিন্য হয়নি। আমার সেই সহপাঠী বন্ধুর কারণেই আজ আমি প্রধানমন্ত্রী। তিনিই আমাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন। এমনিভাবে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়ার সময়ের স্মৃতিচারণ করেন ডা. লোটে শেরিং।

রোববার (১৪ এপ্রিল) সকালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভা ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী।

ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং বলেছেন, ভালো ডাক্তার হতে হলে আগে ভালো মানুষ হতে হবে। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে তাদের মন জয় করতে হবে। মানবিক হতে হবে। মানুষের জন্য কাজ করার অনেক সুযোগ আছে ডাক্তারদের। শুধু চিকিৎসা সেবা নয় সামাজিক-রাজনৈতিক অনেক ক্ষেত্রেই ডাক্তারদের অবদান রাখার সুযোগ আছে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অনেক সহপাঠীর নাম উল্লেখ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ডা. লোটে শেরিং। তিনি বলেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করে আজ আমি ভুটানের প্রধানমন্ত্রী, আমার সেই বন্ধু স্বাস্থ্যমন্ত্রী। আমার আরও অনেক বন্ধু অনেক ভালো জায়াগায় আছেন। তাদের জন্য শুভ কামনা।

তিনি বলেন, আমি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে এসেছি। কিন্তু আমার পেশাকে ছাড়তে পারিনি। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আমি চাকরি না করে, বিদেশে না গিয়ে ভুটানের মানুষকে নিয়ে ভেবেছি। তাদেরকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। তাদেরকে নিয়ে কাজ করেছি। তাই আজ আমি ভুটানের প্রধানমন্ত্রী।

লোটে শেরিং আরও বলেন, আমাদেরকে সকল ভোদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দেশটাকে নিজের ভাবতে হবে। বিশেষ করে ডাক্তারদের মানবিক হতে হবে।

সকালে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং তার শিক্ষা জীবনের স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস পরিদর্শনে আসেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম বাংলাদেশ সফরে এসে শিক্ষা জীবনের স্মৃতিবিজড়িত কলেজের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে নিজের স্মৃতি তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিংয়ের আগমনে সহপাঠী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ছিলেন বেশ আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত।

ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং ক্যাম্পাসে তার স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন এবং তার ব্যাচমেটদের সঙ্গে একান্তে কিছু সময় কাটান। এর আগে ডা. লোটে শেরিং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন। তাকে কাছে পেয়ে সহপাঠী ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সাবেক এবং বর্তমান শিক্ষার্থীরা আবেগাপ্লুত হন।

সকালে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে ময়মনসিংহে পৌঁছালে নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ডা. লোটে শেরিংকে স্বাগত জানান। এ সময় সহপাঠীদের ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হন তিনি।

তার আগমনে মেডিকেল কলেজ, হাসপাতালকে সাজানো হয় বর্ণিল সাজে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাঝখানে দুই দেশের পতাকা, দুই দেশের রাষ্ট্র প্রধানের ছবি, ব্যানার, পোস্টার দিয়ে সজ্জিত করা হয়। শহরজুড়ে নেয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. টান্ডি দরজি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী লায়োনপু দিহেন ওয়াংমু, প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. উগেন ডেমা, বাংলাদেশের ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা সচিব জিএম সালেহ উদ্দিন, জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস, পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. লক্ষ্মী নারায়ণ মজুমদার ও ময়মনসিংহ বিএমএ সভাপতি ডা. মতিউর রহমান ভূঁইয়া প্রমুখ।

২৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে লোটে শেরিং ১৯৯১ সালে বিদেশি কোটায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন। ১৯৯৯ সালে এমবিবিএস পাস করে ঢাকায় সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন।

২০১৩ সালে রাজনীতিতে যোগ দেয়ার পর ১৫ সেপ্টেম্বর ভুটানে অনুষ্ঠিত প্রথম দফা নির্বাচনে লোটে শেরিংয়ের রাজনৈতিক দল জয়লাভ করে। পরে লোটে শেরিংয়ের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম বাংলাদেশ সফরে আসেন তিনি। বন্ধু-সহপাঠীদের সঙ্গে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের লক্ষ্যে ২০ বছর পর ময়মনসিংহে আসেন লোটে শেরিং।

Lotay_Tshering.jpg

ভুটানের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন ময়মনসিংহ মেডিকেলে কলেজের ছাত্র ডা. লোটে শেরিং। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেলে কলেজের ২৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে এসে বিদেশি কোটায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন এবং ১৯৯৯ সালে এমবিবিএস পাস করে ঢাকায় সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে এফসিপিএস কোর্স সমাপ্ত করেন। ডা. লোটে শেরিং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন এমন সংবাদে খুবই গর্ববোধ করছেন তার সহপাঠীরা।

মমেক এর সহপাঠী ডা. আসাদুজ্জামান রতন জানান, লোটে শেরিং ১৯৯১ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস এ ভর্তির পর আমরা বাঘমারা মেডিকেল হোস্টেলে পাশাপাশি ভবনে থাকতাম। মেধাবি ও খুবই নম্র-ভদ্র স্বভাবের লোটে শেরিং থাকতো নতুন ভবনে। প্রতিদিনের পড়াশুনার কাজ প্রতিদিন শেষ করতো। ছাত্র জীবন থেকে সে খুবই বন্ধুসুলভ তবে কম কথা বলতো। পড়াশুনার পাশাপাশি টেবিল টেনিস ও ক্যারাম খেলা পছন্দ করতো সে।

ডা. রতন জানান, লোটে শেরিং ও আমি প্রফেসর ডা. খাদেমুল ইসলামের অধীনে জেনারেল সার্জারি বিষয়ে ৬ মাস ইন্টার্নশিপ করি। পরে সে ঢাকায় সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে এফসিপিএস কোর্স সমাপ্ত করে। ডা. লোটে শেরিং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন জেনে খুবই গর্ববোধ করে তিনি বলেন, যোগ্য মানুষ দেশ পরিচালনার আসলে সুযোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়, এতে তার দেশ আরো এগিয়ে যাবে।

আরেক সহপাঠী ডা. শফিকুল বারী তুহিন জানান, সেশন জট থাকায় আমরা মমেক থেকে ১৯৯৮ সনে পাস করি। সে ২০০৩ সন পর্যন্ত বাংলাদেশে ছিল।

তুহিন আরও জানান, তৎকালীন সময়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ১২/১৩ জন বিদেশি শিক্ষার্থী এমবিবিএস এ পড়াশুনা করতো। তন্মধ্যে ডা. লোটে ছিলো শেরিং খুব মেধাবী। বাংলাদেশে অবস্থানকালীন সময়ে সে বন্ধুদের গ্রামের বাড়িতে ঘুরতে যেত। বিভিন্ন সময় আলোচনার ফাঁকে দেশে গিয়ে রাজনীতি করবে বলেও জানিয়েছিল সে।

জানা যায, ২০১৩ সালে সিভিল সার্ভিস থেকে অব্যাহতি নিয়ে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভুটানে অনুষ্ঠিত প্রথম দফা নির্বাচনে তার রাজনৈতিক ডিএনটি দল জয়লাভ করে চমক সৃষ্টি করে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে প্রথম দফা নির্বাচনে হেরে যান। অবশ্য তিনি পরাজয় মেনে নিয়েছেন।

ডা. লোটে শেরিং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চূড়ান্ত ফলাফল জানা যাবে ১৮ অক্টোবর। ভুটানে দুই দফায় ভোট হয়। প্রথম দফায় ভোটাররা রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোট দেয়। দ্বিতীয় দফায় অর্থাৎ ডা. লোটে শেরিং মুখোমুখি হবেন ডিপিটির ফেনসাম সগবার। কিন্তু ইতোমধ্যে বিপুল ভোটে ডা. লোটে শেরিংয়ের ডিএনটি জয়ী হয়েছে।

রাজনীতিতে আসার আগে ডা. লোটে শেরিং জেডিডব্লিউএনআরএইচ অ্যান্ড মঙ্গার রিজিওনাল রেফারেল হসপিটালে কনসালট্যান্ট সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জেডিডব্লিউএনআরএইচে ইউরোলজিস্ট কনসালট্যান্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর ২০১৩ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং ২০১৮ সালের শুরুতেই দলের শীর্ষপর্যায়ে চলে আসেন ডা. লোটে শেরিং।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আনোয়ার হোসেন বলেন, ময়মনসিংহ মেডেকেল কলেজের ২৮তম ব্যাচের ছাত্র ডা. লোটে শেরিং ভ’টানের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, এটা আমাদের সকলের গর্ব, বাংলাদেশের গর্ব। তার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করেন তিনি।